ড্রোন যুদ্ধের বিশেষ ইউনিট বন্ধ করায় মার্কিন সেনাবাহিনীতে নতুন বিতর্ক শুরু

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় ড্রোন বিশেষায়িত সেনা ইউনিট বন্ধের সিদ্ধান্তে কংগ্রেসে প্রশ্নের মুখে পড়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী।

ড্রোন যুদ্ধের বিশেষ ইউনিট বন্ধ করায় মার্কিন সেনাবাহিনীতে নতুন বিতর্ক শুরু

ড্রোন যুদ্ধের বিশেষ ইউনিট বন্ধ করায় মার্কিন সেনাবাহিনীতে নতুন বিতর্ক শুরু


আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—বিভিন্ন যুদ্ধে ছোট ও মাঝারি আকারের ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমন সময়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ড্রোন-কেন্দ্রিক ইউনিটকে আগের ভূমিকা থেকে সরিয়ে প্রচলিত বিমানবাহিত পদাতিক ইউনিটে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।


কংগ্রেসের দুই দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তাদের প্রশ্ন হলো, যখন বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন যুদ্ধের কৌশল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন কেন এমন একটি ইউনিটের বিশেষায়িত ড্রোন প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম বন্ধ করা হলো?

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ১৭৩তম এয়ারবোর্ন ব্রিগেডের একটি ইউনিট। ইউরোপে অবস্থানরত প্রায় ৬০০ সদস্যের এই ইউনিটকে ড্রোন যুদ্ধের নতুন কৌশল পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল।


ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা দেখেছেন, ছোট ড্রোনও যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, হামলা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।


কম খরচে তৈরি করা ড্রোন অনেক সময় কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জামকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। ফলে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য ড্রোন প্রতিরোধ ও ড্রোন ব্যবহারের কৌশলকে অনেক দেশই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।


এই বাস্তবতার মধ্যেই মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ ড্রোন ইউনিটের কার্যক্রম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আইনপ্রণেতাদের উদ্বিগ্ন করেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিদলীয় একদল মার্কিন আইনপ্রণেতা সেনাবাহিনীর কাছে জানতে চেয়েছেন কেন ইউনিটটিকে ড্রোন যুদ্ধের বিশেষায়িত ভূমিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা মনে করছেন, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য এমন ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ।


ইউনিটটি মাত্র কয়েক মাস আগে ড্রোনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করেছিল। সেখানে সেনারা নিজেরাই ড্রোন তৈরি, পরীক্ষা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছিলেন।


এর উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত সামরিক ব্যবস্থার পাশাপাশি কম খরচে দ্রুত তৈরি করা ড্রোনকে যুদ্ধক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা পরীক্ষা করা।


বিশেষ করে ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখিয়েছে, ড্রোন শুধু বড় সামরিক শক্তির অস্ত্র নয়। অপেক্ষাকৃত কম খরচে তৈরি করা ছোট ড্রোন দিয়েও শত্রুপক্ষের যানবাহন, কামান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব।

কিছু ড্রোন সরাসরি হামলায় ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু ড্রোন শুধু নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হয়। এই কারণে সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন প্রযুক্তিতে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে?


মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীগুলোর একটি। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো দেখিয়েছে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক প্রযুক্তির পাশাপাশি কম খরচের ড্রোনও যুদ্ধের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


একটি ছোট ড্রোন কয়েক হাজার ডলার বা তারও কম খরচে তৈরি হতে পারে। অথচ সেটি ঠেকাতে কখনো কখনো অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়।

এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা ড্রোন যুদ্ধকে ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন।

কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো, এই পরিবর্তন যেন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়নের গতিকে ধীর না করে।

ইউনিটটির বিশেষায়িত কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সময় এসেছে। ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান জেনারেল ক্রিস্টোফার ল্যনেভ এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। এর আগে সেনাবাহিনীর ড্রোন আধুনিকায়নের উদ্যোগে জেনারেল র‌্যান্ডি জর্জ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

প্রতিরক্ষা দপ্তরের নেতৃত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন ও মতবিরোধের খবর রয়েছে। ফলে ইউনিটটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আইনপ্রণেতারা জানতে চাইছেন, সিদ্ধান্তটি কি পেন্টাগনের কেন্দ্রীয় নির্দেশে নেওয়া হয়েছে, নাকি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ছিল।

এ প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি সিদ্ধান্তটি শুধু একটি ইউনিটের পুনর্গঠন হয়, তাহলে বিষয়টি সীমিত। কিন্তু যদি সেনাবাহিনী সামগ্রিকভাবে ড্রোন যুদ্ধের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কমিয়ে দেয়, তাহলে এর প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।


বর্তমানে ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে এক পক্ষ নতুন ড্রোন তৈরি করলে অন্য পক্ষ তার প্রতিরোধের জন্য নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে। ফলে কয়েক মাস আগের কার্যকর প্রযুক্তিও দ্রুত পুরোনো হয়ে যেতে পারে।

এই কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে পরীক্ষামূলক ইউনিট থাকা প্রয়োজন বলে অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। এমন ইউনিট নতুন প্রযুক্তি দ্রুত পরীক্ষা করতে পারে এবং প্রচলিত সেনা কাঠামোর তুলনায় দ্রুত পরিবর্তন আনতে পারে।


অন্যদিকে সেনাবাহিনীর যুক্তি হতে পারে, একটি নির্দিষ্ট ইউনিটকে বিশেষ ড্রোন ভূমিকায় রাখার পরিবর্তে ড্রোন প্রযুক্তিকে পুরো বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে ছড়িয়ে দেওয়া আরও কার্যকর।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ড্রোন ইউনিট থাকবে কি না, সেটি নয়। বরং ড্রোন প্রযুক্তি পুরো মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধ কৌশলে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।


সেনাবাহিনী যদি প্রতিটি পদাতিক ও বিমানবাহিত ইউনিটকে ড্রোন ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়, তাহলে একটি বিশেষ ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা কমতে পারে।


কিন্তু পরীক্ষামূলক বিশেষ ইউনিট না থাকলে নতুন কৌশল উদ্ভাবনের গতি কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। আইনপ্রণেতারা তাই সেনাবাহিনীর কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন।


এই বিতর্ক এমন সময়ে তৈরি হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাতেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরান ও তার মিত্রগোষ্ঠীগুলো ড্রোন ব্যবহার করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রও ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিরোধের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য ড্রোন প্রযুক্তির গুরুত্ব এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি বর্তমান যুদ্ধের বাস্তবতা। এই অবস্থায় একটি বিশেষ ড্রোন ইউনিটের ভূমিকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে।


তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যে মার্কিন সেনাবাহিনী ড্রোন প্রযুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে। বরং বিতর্কটি মূলত কোন কাঠামোয় ড্রোন যুদ্ধের সক্ষমতা তৈরি করা হবে, তা নিয়ে।

আইনপ্রণেতাদের প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। সব মিলিয়ে, ড্রোন যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর সামনে এখন বড় কৌশলগত প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষায়িত ইউনিট রেখে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হবে, নাকি পুরো বাহিনীতে ড্রোন সক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়া হবে—সেটি ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।


কংগ্রেসের চাপের কারণে সেনাবাহিনীকে এখন সিদ্ধান্তটির কারণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ড্রোন যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর