তালেবানের হাতে পাঁচ বছর বন্দিত্বের পরও বাউই বার্গডালের সাজা বাতিলের সিদ্ধান্ত খারিজ, নতুন আইনি লড়াইয়ের মুখে সাবেক মার্কিন সেনা
আফগানিস্তান থেকে পালানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত সাবেক সেনা বোয়ে বার্গডালের সাজা বাতিলের চেষ্টা নাকচ করল মার্কিন আপিল আদালত।
তালেবানের হাতে পাঁচ বছর বন্দিত্বের পরও বাউই বার্গডালের সাজা বাতিলের সিদ্ধান্ত খারিজ, নতুন আইনি লড়াইয়ের মুখে সাবেক মার্কিন সেনা
আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনকালে নিজ অবস্থান ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত সাবেক মার্কিন সেনা বোয়ে বার্গডালের দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আপিল আদালত রায় দিয়েছে, সামরিক আদালতে দেওয়া বার্গডালের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত ও সাজা বাতিল করার ক্ষমতা সাধারণ ফেডারেল জেলা আদালতের ছিল না।
এই রায়ের ফলে বার্গডালের ২০১৭ সালের সামরিক আদালতের রায় বহাল থাকল এবং তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি লড়াই আরও কঠিন হয়ে গেল।
বার্গডালের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি নিজের পোস্ট ছেড়ে চলে যান। এরপর তিনি তালেবানের হাতে বন্দি হন এবং প্রায় পাঁচ বছর তাদের হাতে আটক ছিলেন।
তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাকে খুঁজতে বড় ধরনের অভিযান চালায়। পরে জানা যায়, তিনি আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
২০১৪ সালে বার্গডালকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তালেবানের সঙ্গে বন্দি বিনিময় করে। এর মাধ্যমে পাঁচজন আফগান তালেবান কর্মকর্তাকে গুয়ানতানামো বে কারাগার থেকে কাতারে স্থানান্তর করা হয় এবং বার্গডাল মুক্তি পান।
তার মুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, একজন মার্কিন সেনা কেন নিজের অবস্থান ছেড়ে চলে গেলেন এবং তার কারণে অন্য সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছিল কি না।
পরবর্তীতে বার্গডালের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে মামলা হয়। তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের একটি অংশে দোষ স্বীকার করেন। ২০১৭ সালে সামরিক আদালত তাকে সেনাবাহিনী থেকে অসম্মানজনকভাবে বহিষ্কারের সাজা দেয়। একই সঙ্গে তার বেতন ও পদমর্যাদা সংক্রান্ত শাস্তিও দেওয়া হয়।
তবে বার্গডালের আইনজীবীরা পরে দাবি করেন, তার সামরিক বিচার সঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। তাদের মূল যুক্তি ছিল, সামরিক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বিচারকের সঙ্গে সরকারি চাকরির সম্ভাব্য সম্পর্ক ছিল, যা বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে। এই যুক্তির ভিত্তিতে বার্গডালের পক্ষ থেকে ফেডারেল আদালতে তার সামরিক দণ্ড বাতিলের আবেদন করা হয়।
২০২৩ সালে একটি জেলা আদালত তার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়। আদালত মনে করেছিল, সামরিক বিচারকের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে যথাযথ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি এবং এর ফলে বার্গডালের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে বার্গডালের পুরোনো দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।
কিন্তু মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া সার্কিটের আপিল আদালত বুধবার জানায়, সাধারণ ফেডারেল জেলা আদালত সামরিক আদালতের রায় বাতিল করার মতো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, আপিল আদালতের মতে, সামরিক আদালতের রায় বাতিল করার এখতিয়ার মূলত সামরিক বিচার ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে। সাধারণ ফেডারেল আদালত সামরিক আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে পারলেও সামরিক বিচার ব্যবস্থার নিজস্ব ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করতে পারে না।
এই সিদ্ধান্ত বার্গডালের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ এর ফলে ২০১৭ সালের সামরিক আদালতের রায় আবারও কার্যকর অবস্থায় থাকছে।
তবে তার আইনজীবীরা পুরোপুরি হাল ছাড়েননি। তারা আরও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছেন। প্রয়োজন হলে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
বার্গডালের ঘটনা এত বছর পরও কেন আলোচনায় থাকে, তার একটি বড় কারণ হলো তার মুক্তির সঙ্গে যুক্ত বন্দি বিনিময়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে পাঁচজন তালেবান কর্মকর্তাকে মুক্ত করার বিনিময়ে বার্গডালকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
এই বন্দি বিনিময় নিয়ে তখন রিপাবলিকান নেতারা তীব্র সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, একজন মার্কিন সেনাকে ফিরিয়ে আনতে এতজন তালেবান বন্দিকে মুক্তি দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে বার্গডালের সমর্থকেরা বলেন, একজন মার্কিন সেনাকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনা সরকারের দায়িত্ব এবং তার মুক্তির জন্য আলোচনা করা স্বাভাবিক বিষয়।
রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি তার নিজের বক্তব্যও আলোচনায় আসে। বার্গডাল দাবি করেছিলেন, তিনি নিজের ইউনিটে কিছু সমস্যার বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং তা জানানোর উদ্দেশ্যে অবস্থান ছেড়েছিলেন। কিন্তু সামরিক আদালত তার কর্মকাণ্ডকে গ্রহণযোগ্য মনে করেনি। মামলার সবচেয়ে গুরুতর দিক ছিল, তার চলে যাওয়ার পর তাকে খুঁজতে গিয়ে অন্য মার্কিন সেনারা বিপদের মুখে পড়েছিলেন কি না। প্রসিকিউশন এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে।
বার্গডালের আইনজীবীরা অবশ্য তার কর্মকাণ্ডের পেছনে ভিন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য ছিল, তাকে সরাসরি একজন বিশ্বাসঘাতক বা ইচ্ছাকৃতভাবে শত্রুর হাতে আত্মসমর্পণকারী হিসেবে দেখানো উচিত নয়।
এই বিতর্কের মধ্যেই ২০১৭ সালে সামরিক আদালতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নতুন আপিল আদালতের রায় মূলত তার পুরোনো মামলার মূল অভিযোগ নতুন করে বিচার করছে না। বরং প্রশ্নটি ছিল—একটি ফেডারেল জেলা আদালত সামরিক আদালতের রায় বাতিল করতে পারে কি না।
আপিল আদালত বলেছে, জেলা আদালত সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেনি। আইনি বিশেষজ্ঞদের জন্য এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সামরিক বিচারব্যবস্থা এবং সাধারণ ফেডারেল আদালতের এখতিয়ারের সীমা স্পষ্ট করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে কর্মরত সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা সাধারণ অপরাধের মামলার মতো নয়। তাদের জন্য আলাদা সামরিক বিচারব্যবস্থা রয়েছে।
সামরিক আদালতের সিদ্ধান্তকে ফেডারেল আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকলেও কোন আদালত কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বার্গডাল মামলায় সেই সীমারেখাই আবার সামনে এসেছে। এই ঘটনা মার্কিন সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ও শৃঙ্খলা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
সেনাবাহিনীতে একজন সদস্য নিজের পোস্ট ছেড়ে চলে গেলে সেটিকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন সেনার অবস্থান পুরো ইউনিটের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশেষ করে আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো সেনা নিখোঁজ হলে তাকে খুঁজতে অভিযান চালানো প্রয়োজন হয়। এতে উদ্ধারকারী সেনারাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।
বার্গডালের ঘটনা তাই সামরিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, যুদ্ধক্ষেত্রের মানসিক চাপ এবং সামরিক আইনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক তৈরি করেছে।
এখন আপিল আদালতের নতুন রায়ের পর তার আইনজীবীদের সামনে সীমিত আইনি পথ রয়েছে। তারা চাইলে উচ্চতর আদালতে যেতে পারেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।