মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে, ডাকযোগে ভোট নিয়ে নতুন বড় উদ্বেগ প্রকাশ
নতুন ডাকভোট যাচাই ব্যবস্থা নিয়ে হুইসেলব্লোয়ারের সতর্কতা, ভুল হলে হাজার হাজার বৈধ ভোট বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে, ডাকযোগে ভোট নিয়ে নতুন বড় উদ্বেগ প্রকাশ
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডাকযোগে ভোট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন ডাক বিভাগের একজন হুইসেলব্লোয়ার অভিযোগ করেছেন, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট যাচাই ও বাছাইয়ের জন্য যে নতুন কম্পিউটার ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, সেটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত পরীক্ষা ছাড়াই চালু করার চেষ্টা চলছে।
এই ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করলে বিপুল সংখ্যক বৈধ ডাকভোট গ্রহণে সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থা। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ ভোটার, সামরিক সদস্য, বিদেশে থাকা মার্কিন নাগরিক এবং নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারা অনেক মানুষ ডাকযোগে ভোট দেন।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী পদে ভোট হবে। ফলে ডাকভোটের সামান্য ত্রুটিও নির্বাচনী ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন ব্যবস্থাটি নিয়ে অভিযোগ করেছেন ডাক বিভাগের একজন হুইসেলব্লোয়ার। তার দাবি, ব্যালট যাচাইয়ের নতুন প্রযুক্তি অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে। সাধারণত এত বড় একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা তৈরি, পরীক্ষা ও বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। কিন্তু এবারের ব্যবস্থাটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত তৈরি করা হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় ছোটখাটো প্রযুক্তিগত বা স্ক্যানিং ত্রুটির কারণে একসঙ্গে থাকা অনেক ব্যালটও সমস্যায় পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি ব্যালটের তথ্য বা শনাক্তকরণে সমস্যা হলে একই ব্যাচের অন্যান্য ব্যালটও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ নিয়ে কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কানেকটিকাটের ডেমোক্রেটিক সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ডাক বিভাগের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, নতুন ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি হয়েছে, কী ধরনের পরীক্ষা করা হয়েছে এবং নির্বাচনের সময় কোনো ব্যালট আটকে গেলে তার সমাধান কী হবে।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ডাক বিভাগ কি শুধু ব্যালট পরিবহনের দায়িত্ব পালন করবে, নাকি নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে?
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা মূলত অঙ্গরাজ্যভিত্তিক। প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব নির্বাচনী নিয়ম, ভোটার তালিকা এবং ডাকভোটের পদ্ধতি রয়েছে। ফলে একটি কেন্দ্রীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যদি বিভিন্ন রাজ্যের ডাকভোটের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে সেটি আইনগত প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।
এই কারণে বিষয়টি ইতোমধ্যে আদালতের নজরেও এসেছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ডাকভোটের নতুন ব্যবস্থাকে ঘিরে আদালতে পৃথক আইনি লড়াই চলছে। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের ডাকভোট-সংক্রান্ত আদেশের একটি অংশ কার্যকর হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। একই সময়ে পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে আলাদা আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
এই জটিলতার কারণে ডাক বিভাগের কর্মীদের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রশাসনের নির্দেশ পালন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আদালতের নির্দেশও মানতে হচ্ছে।
নতুন ব্যবস্থার সমর্থকেরা বলছেন, নির্বাচনী ডাকব্যবস্থায় জালিয়াতি বা ভুল ঠেকাতে আরও শক্তিশালী যাচাই ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাদের মতে, ভোটার তালিকা ও ব্যালটের তথ্যের মধ্যে মিল নিশ্চিত করা গেলে ভুল বা অননুমোদিত ব্যালটের ঝুঁকি কমতে পারে। কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত যাচাইয়ের ফলে বৈধ ভোটারদের ব্যালটও ভুলভাবে আটকে যেতে পারে।
এই জায়গাতেই হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার দাবি, নতুন প্রযুক্তির ভুলের ক্ষেত্রে পুরো ব্যাচের ব্যালট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়। ধরুন, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কয়েক হাজার ভোটার ডাকযোগে ব্যালট পাঠালেন। ব্যালটগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় স্ক্যান ও যাচাই করা হলো। যদি সফটওয়্যারের কোনো ত্রুটির কারণে ব্যাচটির একটি অংশ সঠিকভাবে শনাক্ত না হয়, তাহলে শুধু একজন ভোটারের ব্যালট নয়, একসঙ্গে অনেক ব্যালট সমস্যায় পড়তে পারে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত নতুন ব্যবস্থাটি বাস্তবে কত ভোট বাতিল করবে, তার কোনো নিশ্চিত সংখ্যা নেই। হুইসেলব্লোয়ারের সতর্কতা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে, নিশ্চিত ফলাফল নিয়ে নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে যথাযথ পরীক্ষা ও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ডাক বিভাগও বলেছে, তারা আদালত ও কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করছে এবং ডাকভোট যথাযথভাবে সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
এই বিতর্কের রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ডাকযোগে ভোটের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার প্রশাসন ডাকভোটের নিয়ম আরও কঠোর করার চেষ্টা করছে।
ডেমোক্রেটিক নেতারা বলছেন, এসব পরিবর্তন ভোটারদের ভোটাধিকার সীমিত করতে পারে। বিশেষ করে ডাকভোটের ওপর নির্ভরশীল মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন।
রিপাবলিকান পক্ষের যুক্তি হলো, নির্বাচনী ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও যাচাই আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাদের মতে, ভোটারদের পরিচয় এবং বৈধতা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে মার্কিন ডাক বিভাগ।
নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্কও তত বাড়ছে। কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডাকভোটের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে খুব কম সময় রয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবস্থার ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নতুন ব্যবস্থাটি পর্যাপ্তভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না। একটি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তি চালুর আগে সাধারণত একাধিক ধাপে পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ব্যর্থতার বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
যদি কোনো কারণে নতুন প্রযুক্তি কাজ না করে, তখন পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, ডাকভোটের ক্ষেত্রে শেষ সিদ্ধান্ত কার? ডাক বিভাগ, রাজ্য নির্বাচন কর্তৃপক্ষ নাকি আদালত—এ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ডাকযোগে ভোটের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বড় একটি নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠছে। হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ এখন কংগ্রেস, আদালত এবং ডাক বিভাগের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে এখনো বলা যায় না যে বিপুলসংখ্যক ভোট নিশ্চিতভাবে বাতিল হবে। বরং বর্তমান তথ্য থেকে বলা যায়, নতুন ব্যবস্থার সম্ভাব্য ত্রুটি নিয়ে গুরুতর সতর্কতা এসেছে এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—বৈধ ভোট যেন কোনো প্রযুক্তিগত ভুলের কারণে হারিয়ে না যায়।