ট্রাম্পের নীতিতে ক্ষুব্ধ কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে দেশটি
বাণিজ্যযুদ্ধ ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে বদলে যাচ্ছে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন পথে হাঁটছে কানাডা।
ট্রাম্পের নীতিতে ক্ষুব্ধ কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে দেশটি
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্য বিরোধ, শুল্কনীতি এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে কানাডার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি পর্যায়েও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
রয়টার্সের ২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মানুষের মনোভাব বদলেছে। একসময় দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত, ব্যবসা, ভ্রমণ ও সরবরাহব্যবস্থা এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে আলাদা করে ভাবা কঠিন ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধ সেই সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই পরিবর্তনের একটি প্রতীকী উদাহরণ হলো কানাডার রাজধানী অটোয়ায় একটি রাস্তার নাম নিয়ে বিতর্ক। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ‘ট্রাম্প অ্যাভিনিউ’ নামে একটি সড়ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে সেই নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে বিষয়টি শুধু রাস্তার নাম বা প্রতীকী প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার ব্যবসাগুলোও সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সরবরাহকারীদের বিকল্প খুঁজছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে বাণিজ্যনীতি বা শুল্কের কারণে যেন তাদের ব্যবসা বড় ঝুঁকির মুখে না পড়ে।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি
ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দুই দেশের মধ্যে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা আদান-প্রদান হয়। কানাডার অনেক শিল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রধান বাজার। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানি কানাডার কাঁচামাল, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
এই পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ শুধু রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ব্যবসা, চাকরি, বিনিয়োগ এবং ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি নিয়ে কানাডার পক্ষ থেকে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ আবহের পাশাপাশি প্রতিযোগিতা ও অবিশ্বাসও বাড়ছে।
কানাডার জনগণের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে মনোভাব পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এমন মানুষের কথা তুলে ধরা হয়েছে যারা আগে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য, ভ্রমণ ও ব্যবসার ওপর স্বাভাবিকভাবেই নির্ভর করতেন। এখন তারা বিকল্পের দিকে তাকাচ্ছেন।
এ পরিবর্তনের পেছনে শুধু শুল্ক নয়, রাজনৈতিক বক্তব্যও ভূমিকা রাখছে। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার বিষয়ে ট্রাম্পের অতীত মন্তব্য কানাডায় ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি করেছে। কানাডার জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি সেখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
দুই দেশের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ অর্থনীতি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক নির্ভরতা অনেক গভীর। কিন্তু দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে কানাডা যদি নতুন বাজার খুঁজতে থাকে, ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ায় এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে উৎসাহ দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তার অর্থনৈতিক নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও কানাডা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। জ্বালানি, গাড়ি শিল্প, কৃষিপণ্য, খনিজ ও উৎপাদন খাতে দুই দেশের সরবরাহব্যবস্থা বহু বছর ধরে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। তাই বর্তমান বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির সম্ভাবনা দুই দেশেরই রয়েছে।কোম্পানিগুলোকে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে হবে, পণ্যের দাম বাড়তে পারে এবং সীমান্ত বাণিজ্যে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে কানাডার পর্যটন খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে। কানাডীয় পর্যটকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী রাজ্য ও পর্যটননির্ভর শহরগুলোও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে পুরনো বন্ধুত্ব থাকলেও পারস্পরিক আস্থার জায়গায় নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। কানাডা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না, কিন্তু নিজের অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিবর্তনগুলো তাই শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; দীর্ঘমেয়াদে উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামোতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।