বাদশাহ ফয়সালের ঐতিহাসিক সফর থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বে সৌদি–ফ্রান্স সম্পর্ক

১৯৬৭-এর ঐতিহাসিক বৈঠক থেকে আজকের কৌশলগত অংশীদারত্বে নতুন উচ্চতায় সৌদি–ফ্রান্স সম্পর্ক।

বাদশাহ ফয়সালের ঐতিহাসিক সফর থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বে সৌদি–ফ্রান্স সম্পর্ক

বাদশাহ ফয়সালের ঐতিহাসিক সফর থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বে সৌদি–ফ্রান্স সম্পর্ক


সৌদি আরব ও ফ্রান্সের মধ্যকার সম্পর্ক এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো নতুন ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ছে।

দুই দেশের সম্পর্কের শিকড় আরও পুরোনো। ১৮৩৯ সালে ফ্রান্স জেদ্দায় একটি কনস্যুলেট প্রতিষ্ঠা করে, যা আরব উপদ্বীপে দেশটির প্রথম কূটনৈতিক পোস্ট ছিল। ১৯২৬ সালে ফ্রান্স হিজাজ ও নজদের রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করে। পরবর্তী সময়ে সৌদি আরব ও ফ্রান্সের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়তে থাকে।

তবে আধুনিক সৌদি–ফ্রান্স সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে ১৯৬৭ সালে বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজের প্যারিস সফর। সে সময় তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধের মাত্র কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ফ্রান্সের অবস্থানের সঙ্গে সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বহুমুখী করার সৌদি উদ্যোগ এ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেয়।

এরপর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও দ্রুত বিস্তৃত হয়। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে সৌদি আরবের সামরিক সরঞ্জামের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হয় এবং ফ্রান্স দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী হয়ে ওঠে।

১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ভ্যালেরি জিসকার দ্যস্তাঁর সৌদি আরব সফরও সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে দুই দেশের রাজা, যুবরাজ ও প্রেসিডেন্টদের নিয়মিত সফর রাজনৈতিক আস্থা ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও দৃঢ় করে। প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কও ক্রমে বিস্তৃত হয়।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ ঘোষণার পর দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন গতি আসে। সৌদি আরব অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে প্রযুক্তি, পর্যটন, অবকাঠামো, সংস্কৃতি ও শিল্পভিত্তিক নতুন অর্থনীতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। এ প্রক্রিয়ায় ফরাসি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিনিয়োগ সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সৌদি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ফ্রান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য। সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আলউলা অঞ্চলের উন্নয়ন প্রকল্পে ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, পর্যটন অবকাঠামো, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশ এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা গড়ে তুলেছে।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও এখন সৌদি–ফ্রান্স অংশীদারত্বের নতুন স্তম্ভ। ২০২৩ সালের পর থেকে দুই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, উন্নত গবেষণা, কম্পিউটিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সৌদি সফরের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও স্মার্ট সিটিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ওই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করে। সৌদি আরব ও ফ্রান্স দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার জন্য একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব পরিষদ প্রতিষ্ঠা এবং এর জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। পরিষদটি সৌদি যুবরাজ ও ফরাসি প্রেসিডেন্টের যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার কথা।

বর্তমানে প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনীতিও সৌদি–ফ্রান্স সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। দুই দেশ ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকট, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার বিষয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেও ফ্রান্স সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে।

১৯৬৭ সালে বাদশাহ ফয়সাল ও শার্ল দ্য গলের ঐতিহাসিক বৈঠক থেকে শুরু করে বর্তমান প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা—সৌদি আরব ও ফ্রান্সের সম্পর্ক কয়েক দশকে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। দুই দেশের স্বার্থ ও সক্ষমতার পারস্পরিক পরিপূরকতা ভবিষ্যতে এই অংশীদারত্বকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর