ভারত সফর ব্যাহত হলে ঝুঁকিতে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২৩–২৪ আগস্টের সম্ভাব্য সফরটি হচ্ছে না বলে আজ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে আগস্টের মধ্যেই সফরের নতুন সময় নিয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে

ভারত সফর ব্যাহত হলে ঝুঁকিতে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি

ভারত সফর ব্যাহত হলে ঝুঁকিতে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি


বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২৩–২৪ আগস্টের সম্ভাব্য সফরটি হচ্ছে না বলে আজ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে আগস্টের মধ্যেই সফরের নতুন সময় নিয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। 

এই সফরটি শুধু সৌজন্য সফর ছিল না—বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার সম্ভাবনা ছিল। ফলে সফর দীর্ঘায়িতভাবে ব্যাহত হলে বছরের শেষ দিকে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে ৩০ বছরের চুক্তি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর এবং ডিসেম্বর ২০২৬-এ এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় নথিতেও চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। 

চুক্তির আওতায় মূলত ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি কীভাবে ভারত ও বাংলাদেশ ভাগ করবে, তার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে।

ফারাক্কায় পানির প্রাপ্যতা অনুযায়ী বণ্টনের মূল কাঠামো হলো—

ফারাক্কায় প্রবাহ

বাংলাদেশের অংশ/ ভারতের অংশ

৭০,০০০ কিউসেক বা কম (৫০%/৫০%)

৭০,০০০–৭৫,০০০ কিউসেক (৩৫,০০০/ অবশিষ্ট)

৭৫,০০০ কিউসেক বা বেশি ( অবশিষ্ট/৪০,০০০ কিউসেক)

চুক্তিতে এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট প্রবাহের নিশ্চয়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। 

কেন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এত গুরুত্বপূর্ণ?

চুক্তি নবায়নের জন্য শুধু প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকই আইনগতভাবে অপরিহার্য—এমন নয়। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনসহ বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমেই আলোচনা করা সম্ভব। ভারতও আগস্টে জানিয়েছে, গঙ্গা চুক্তির আলোচনা বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার অধীনেই হবে। 

তবে রাজনৈতিক পর্যায়ে একটি সমঝোতা তৈরি হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চুক্তি নবায়ন এখন আর কেবল কারিগরি বিষয় নয়; এর সঙ্গে পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানে পানি ব্যবহার এবং দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত।

ভারতের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ ৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ নেয় এবং একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলও গঠন করেছে বলে ThePrint জানিয়েছে। কিন্তু আলোচনার সময়সূচি নিয়ে দিল্লির কাছ থেকে তখনও অপেক্ষা করতে হচ্ছিল।

অর্থাৎ, সফর যত বিলম্বিত হবে, রাজনৈতিক পর্যায়ে দ্রুত সমঝোতা তৈরির সময়ও তত কমবে।

ঝুঁকিটা কোথায়?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর না হলেই গঙ্গা চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা অকার্যকর হয়ে যাবে না। চুক্তির নবায়ন দুই দেশের পারস্পরিক সম্মতির বিষয় এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনা অন্য কূটনৈতিক চ্যানেলেও হতে পারে। 

তবে সফর দীর্ঘ সময় পিছিয়ে গেলে তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে-

১. রাজনৈতিক সমঝোতার সময় কমে যাবে

ডিসেম্বরের আগে মাত্র কয়েক মাস সময় রয়েছে। এই সময়ে নতুন চুক্তির শর্ত নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো, কারিগরি তথ্য যাচাই এবং রাজনৈতিক অনুমোদন—সবকিছু করতে হবে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চুক্তির আরও ভালো শর্তে নবায়ন করতে আগ্রহী। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে এবং নবায়নটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। 

২. পুরনো চুক্তির দুর্বলতাগুলো নতুন আলোচনায় বড় ইস্যু হবে

১৯৯৬ সালের চুক্তি মূলত ১৯৯০-এর দশকের নদীর প্রবাহ ও পানির চাহিদার বাস্তবতার ওপর তৈরি। এখন জলবায়ু পরিবর্তন, গঙ্গা অববাহিকায় পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের পরিবর্তন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

তাই বাংলাদেশ শুধু পুরনো চুক্তি নবায়ন নয়, আরও নির্ভরযোগ্য পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা চাইতে পারে। 

৩. পানি ইস্যু আবার বড় রাজনৈতিক বিরোধে পরিণত হতে পারে

ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও তাঁর প্রত্যর্পণ দাবিকে কেন্দ্র করে চাপের মধ্যে রয়েছে। Reuters জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের ক্ষেত্রেও ঢাকা ভারতের কাছে হাসিনাসহ অন্য পলাতকদের প্রত্যর্পণ বিষয়ে জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। 

এ অবস্থায় একটি বিষয় আরেকটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে—রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে পানি নিয়ে আলোচনা ধীর হতে পারে, আর পানি নিয়ে অগ্রগতি না হলে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও কঠিন হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

গঙ্গার পানি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নদীর পানি নয়। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও এর শাখা-প্রশাখার প্রবাহ সেচ, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ততার চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে চুক্তির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পানি ও পরিবেশ নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারও ২০২৬ সালের নবায়নকে পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবে আশার জায়গাও আছে

পরিস্থিতি এখনই চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন তথ্য নেই। বরং দুই দেশ চুক্তি নবায়নের আলোচনা চালানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারত বলেছে, যৌথ নদী কমিশনের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা হবে। বাংলাদেশের সংসদীয় কমিটিকেও আগস্টে জানানো হয়েছে যে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে ভারত থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে। 

তাই বর্তমান সংকটকে বলা যায় “চুক্তি বাতিলের ঝুঁকি” নয়, বরং “চুক্তি নবায়নে রাজনৈতিক সময় কমে যাওয়ার ঝুঁকি”।

তারেক রহমানের ভারত সফর যদি সাময়িকভাবে পিছিয়েই যায়, তাহলে গঙ্গা চুক্তি সঙ্গে সঙ্গে বিপদের মধ্যে পড়বে না। কিন্তু সফর দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থাকলে ঢাকা–দিল্লির রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ নষ্ট হতে পারে, আর ডিসেম্বরের আগে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সমঝোতা তৈরির সময়ও সংকুচিত হবে।

এ কারণেই ২০২৬ সালের শেষ দিকে তারেক রহমানের ভারত সফর এবং গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়নকে আলাদা দুটি ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। একটির অগ্রগতি অন্যটির জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা এখন—ডিসেম্বর ২০২৬। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমঝোতা না হলে বাংলাদেশ-ভারত পানি কূটনীতিতে একটি নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায় শুরু হতে পারে।

বিশ্লেষণ : এস গোস্বামী 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর