কিমকে কাছে টানতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমালেন ট্রাম্প
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে আঞ্চলিক সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা
কিমকে কাছে টানতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমালেন ট্রাম্প
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে আঞ্চলিক সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা।
বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম বড় সামরিক মহড়া পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু ট্রাম্পের নির্দেশে চলতি বছরের Ulchi Freedom Shield মহড়া সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে এবং এর কিছু লাইভ-ফায়ার বা সরাসরি গোলাবর্ষণ প্রশিক্ষণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের জোট ও অংশীদারিত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে এ পদক্ষেপ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি দুর্বল করতে পারে।
মহড়ায় বড় ধরনের কাটছাঁট
Ulchi Freedom Shield সাধারণত ১১ দিন ধরে চলে। অতীতে এতে ১৭ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা এবং প্রায় ৫০ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা অংশ নিয়েছেন। চলতি বছর প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে কতজন মার্কিন সেনা অংশ নেওয়ার কথা ছিল, তা পেন্টাগন প্রকাশ করেনি।
মহড়ার একটি অংশে সিউলের দক্ষিণে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি অনুশীলন করা হয়। পাশাপাশি বড় পরিসরে সেনা মোতায়েন, কমান্ড পরিচালনা এবং লাইভ-ফায়ার প্রশিক্ষণও অনুষ্ঠিত হয়।
দুই দেশই বরাবর বলে আসছে, মহড়াগুলো প্রতিরক্ষামূলক। তবে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন এগুলোকে উসকানিমূলক বলে অভিহিত করেছেন। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মহড়াকে “আগ্রাসী যুদ্ধের মহড়া” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
চলতি মাসে উত্তর কোরিয়া পূর্ব উপকূল থেকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। দেশটি জানিয়েছে, নতুন মাত্রার হুমকির জবাব দিতে তারা নতুন মাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলবে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পও উত্তর কোরিয়াকে তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে “হুমকিহীন ও শ্রদ্ধাশীল” হিসেবে বর্ণনা করেন।
সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ
সাবেক ও বর্তমান মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, মহড়ার গুরুত্বপূর্ণ দুটি অংশে কাটছাঁট হলে প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চপর্যায়ের কমান্ড-সংক্রান্ত জটিল পরিস্থিতির অনুশীলন এবং বড় আকারের স্থলভিত্তিক লাইভ-ফায়ার ও সেনা কৌশলগত মোতায়েনের প্রশিক্ষণ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (CSIS) কোরিয়া চেয়ার ভিক্টর চা বলেন, এতে অবশ্যই সামরিক প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর মতে, সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে প্রতিরোধক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চীন বা উত্তর কোরিয়া যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়েছে, তাহলে তারা নতুন সুযোগ দেখতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কমান্ডার জেনারেল কার্টিস এম. স্ক্যাপারোটি বলেন, লাইভ-ফায়ার প্রশিক্ষণ কমে গেলে সেনাদের যুদ্ধের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ কমে যায়। তাঁর মতে, বাস্তব যুদ্ধের মতো প্রশিক্ষণ সেনাদের সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং ইউনিটের প্রকৃত প্রস্তুতি যাচাইয়ের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।
২০১৮ সালেও মহড়া বাতিল করেছিলেন ট্রাম্প
ট্রাম্পের সামরিক মহড়া বন্ধ বা কমানোর সিদ্ধান্ত এবারই প্রথম নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে তিনি হঠাৎ করে একই ধরনের একটি মহড়া বাতিল করেছিলেন। সে সময় তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসকেও আগে থেকে জানানো হয়নি।
তখন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করতেই মহড়া স্থগিত করা হয়েছিল।
ট্রাম্প পরে কিম জং-উনের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। ২০১৯ সালে হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পরিধি নিয়ে মতবিরোধের কারণে ব্যর্থ হয়।
সাবেক কর্মকর্তারা সে সময় সতর্ক করেছিলেন, সামরিক মহড়ার একবার বড় ধরনের বিরতি সামলানো সম্ভব হলেও কয়েক বছর ধরে মহড়া বন্ধ থাকলে সামরিক প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক কারণও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া তাঁর প্রশাসনকে যথেষ্ট সমর্থন করেনি। তিনি মহড়ার ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, এর বড় অংশের খরচ সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের মহড়ার আনুমানিক ব্যয় ছিল ৬৯ লাখ ডলার। তবে মহড়া কমানোর ফলে কত অর্থ সাশ্রয় হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, সেনাদের দক্ষিণ কোরিয়ায় আনা-নেওয়াসহ বেশিরভাগ ব্যয় ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের ঘোষণায় কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মহড়া নিয়ে সমন্বয় অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কিমের সঙ্গে আবার বৈঠকের পরিকল্পনা ট্রাম্পের
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠায় ট্রাম্প আবার উত্তর কোরিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। উত্তর কোরিয়া এখন কার্যত একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প অন্তত দুবার কিম জং-উনের সঙ্গে নিজের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। শনিবার এক ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, “কিম জং-উন এবং আমি দারুণভাবে মিলি!”
বুধবার ট্রাম্প জানান, চলতি বছরের কোনো এক সময় তিনি কিমের সঙ্গে বৈঠক করতে চান। তবে বৈঠকের নির্দিষ্ট সময় বা স্থান জানাননি।
এদিকে কিম জং-উনের বোন ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা কিম ইয়ো-জং বুধবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি, যদিও ট্রাম্প সামরিক মহড়া সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।