ট্রাম্পের জন্য গোপন ফ্লাইট ছিল চমকপ্রদ কৌশল, পুতিনের কাছে ‘নিত্যদিনের ব্যাপার’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এয়ার ফোর্স ওয়ান নিয়ে গোপন কৌশল ছিল সরকারি পর্যায়ে তথ্য গোপন ও বিভ্রান্তির একটি চমকপ্রদ ঘটনা। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে যে মাত্রার গোপনীয়তা রয়েছে, তার তুলনায় সেটি অনেকটাই ছোট ঘটনা। পুতিনের চলাফেরা নিয়ে রহস্য এতটাই গভীর যে সাংবাদিকরা কখনো কখনো তাঁর কার্যালয়ের গাছের পাতার শুকিয়ে যাওয়ার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করেও তাঁর অবস্থান বা বৈঠকের সময় নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন
ট্রাম্পের জন্য গোপন ফ্লাইট ছিল চমকপ্রদ কৌশল, পুতিনের কাছে ‘নিত্যদিনের ব্যাপার’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এয়ার ফোর্স ওয়ান নিয়ে গোপন কৌশল ছিল সরকারি পর্যায়ে তথ্য গোপন ও বিভ্রান্তির একটি চমকপ্রদ ঘটনা। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে যে মাত্রার গোপনীয়তা রয়েছে, তার তুলনায় সেটি অনেকটাই ছোট ঘটনা। পুতিনের চলাফেরা নিয়ে রহস্য এতটাই গভীর যে সাংবাদিকরা কখনো কখনো তাঁর কার্যালয়ের গাছের পাতার শুকিয়ে যাওয়ার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করেও তাঁর অবস্থান বা বৈঠকের সময় নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন।
২০২৬ সালে কয়েকজন সাংবাদিক পুতিনের টেলিভিশনে প্রচারিত বৈঠকগুলো আসলে কখন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা যাচাই করতে তাঁর কার্যালয়ের গাছপালার অবস্থা বিশ্লেষণ করেন। গাছের পাতার শুকিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখে ধারণা করা হয়, ক্রেমলিন যে ক্রম ও সময়ে বৈঠকগুলোর কথা জানিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবে ভিন্ন দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
রুশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিনের ভাষায়, রাশিয়ার তুলনায় ট্রাম্পের গোপন ফ্লাইটের ঘটনা ছিল ‘শিশুসুলভ ব্যাপার’।
পুতিন তাঁর বিভিন্ন বাসভবনে প্রায় একই রকম দেখতে অফিস তৈরি করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে ভিডিও ফুটেজে বৈঠকের দৃশ্য দেখিয়ে তাঁর প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে একটি বিশেষ প্রেসিডেন্ট ট্রেন, গোপন রেললাইন এবং অন্তত তিনটি সরকারি বাসভবনের কাছে বিশেষ স্টেশন তৈরি করা হয়েছে বলেও সংবাদমাধ্যমে তথ্য এসেছে।
রুশ সরকারি কর্মকর্তাদের অনেক সময় পুতিনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের তথ্য গোপন রাখতে হয়। বৈঠকটি টেলিভিশনে প্রচার না হওয়া পর্যন্ত সেটি সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয় না। কখনো কখনো বৈঠকটি কয়েক সপ্তাহ পর প্রচার করা হয়, অথচ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন সেটি প্রচারের দিনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাশিয়ার নির্বাসিত সাংবাদিক ফারিদা রুস্তামোভা বলেছেন, পুতিনের অবস্থান নিয়ে সরকারি মিথ্যাচার রাশিয়ায় এতটাই স্বাভাবিক যে সেটিকে তিনি ‘নিত্যদিনের মঙ্গলবার’ বলে অভিহিত করেছেন।
পুতিনের আগে ধারণ করা বৈঠকের ভিডিওগুলোর জন্য রুশ সাংবাদিকদের মধ্যে একটি বিশেষ শব্দও প্রচলিত হয়েছে—‘কনসারভি’ (konservy), যার অর্থ মোটামুটি ‘ক্যানজাত খাবার’। অর্থাৎ আগে ধারণ করা ভিডিও পরে প্রয়োজনমতো প্রকাশ করা।
ক্রেমলিন অবশ্য অতীতে পুতিনের অবস্থান সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গোপন ট্রেন ও বিকল্প কার্যালয়
২০২১ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক লেক ভালদাই এলাকায় পুতিনের একটি সরকারি বাসভবনের কাছাকাছি গিয়ে একটি রহস্যময় রেললাইন নির্মাণের বিষয়টি জানতে পারেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নতুন রেললাইনটি পুতিনের কম্পাউন্ডের দিকে তৈরি করা হয়েছিল। স্যাটেলাইট ছবিতেও এমন একটি নতুন স্টেশন দেখা যায়, যেখানে হেলিপ্যাড ছিল, কিন্তু সেটি সাধারণ রেলওয়ে মানচিত্র বা সময়সূচিতে ছিল না।
২০২৩ সালে রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা FSO-এর একজন পলাতক কর্মকর্তা দাবি করেন, পুতিন নজরদারি এড়াতে ট্রেনে যাতায়াত করতেন। ফাঁস হওয়া নথিতে একটি বিশেষ সাঁজোয়া ট্রেনের অস্তিত্বের কথাও উঠে আসে। ট্রেনটি সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো রং করা হলেও এতে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় পরিচালনার উপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিম ও স্পা পর্যন্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
পুতিনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কোভিড-১৯ মহামারির সময় আরও বেড়ে যায়। তখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া কর্মকর্তাদের দুই সপ্তাহ পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হতো। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতা তাঁর অবস্থান গোপন রাখাও সহজ করে দেয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর পুতিনের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার আরও গভীরে হামলা চালাতে সক্ষম হওয়ায় তাঁর চলাচল নিয়েও নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মস্কোতে এখন এমনও আলোচনা রয়েছে যে পুতিনকে বহন করছে বলে ধারণা করা বিশাল মোটরকেডের কিছু গাড়ি আসলে ডিকয় বা বিভ্রান্তিমূলক বহর হতে পারে।
‘পুতিনের জনসম্মুখের ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ সাজানো’
রুবিন ২০২০ সালে প্রথম রিপোর্ট করেছিলেন যে পুতিন মস্কোর উপকণ্ঠ ও কৃষ্ণসাগরের সোচিতে থাকা তাঁর বিভিন্ন বাসভবনে প্রায় একই রকম দেখতে অফিস ব্যবহার করেন। এর ফলে ক্রেমলিন তাঁর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে পারে।
পরবর্তী তদন্তে ওই অফিসগুলোর মধ্যে দরজার হাতল, দেয়ালের জোড় ও অন্যান্য ক্ষুদ্র পার্থক্য শনাক্ত করা হয়। এসব পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, একই ধরনের ভিডিও আসলে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ধারণ করা হয়েছিল।
রুবিন জানান, প্রায় এক দশক আগে ক্রেমলিন কভার করার সময়ই তিনি পুতিনের গোপনীয়তার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পান। একবার তিনি পুতিনের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের একটি বৈঠকে যোগ দিতে আসতে দেখেছিলেন। কিন্তু ক্রেমলিন সেই বৈঠকের ঘোষণা কয়েক দিন পর এমনভাবে দেয়, যেন সেটি তখনই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
রুবিনের উপলব্ধি ছিল—পুতিনের জনসম্মুখের ভাবমূর্তি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা; শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এর বড় অংশই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
শুধু নিরাপত্তা নয়, ক্ষমতার ভাবমূর্তিও
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুতিনের এই গোপনীয়তা শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়। এর মাধ্যমে তাঁর চারপাশে সবসময় সক্রিয়, নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং সর্বত্র উপস্থিত একজন শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তি তৈরি করাও সম্ভব হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক নজরদারি রাশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি। তারপরও ট্রাম্প প্রশাসনের সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ এবং গত মাসে প্রেসিডেন্টের গোপন বিমান পরিবর্তনের ঘটনা কিছু রুশ সাংবাদিকের কাছে পরিচিত ধরনের প্রবণতা মনে হয়েছে।
রুবিনের মতে, পুতিন এমন এক নেতার চরম উদাহরণ, যিনি তাঁকে ঘিরে ঘটে যাওয়া সবকিছুকে প্রায় অবাস্তবতার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্পকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি সেই দিকেই মাত্র এগোতে শুরু করেছেন।