আইএমএফের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সমঝোতার পথে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে নতুন করে ৪.৫ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১২–১৭ জুলাই ঢাকা সফরে আসছে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।
আইএমএফের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সমঝোতার পথে বাংলাদেশ
নতুন ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে জুলাইয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু, ১২–১৭ জুলাই ঢাকা সফরে প্রতিনিধিদল
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল
ঢাকা: বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচির আওতায় ৪.৫ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী ১২ থেকে ১৭ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ঢাকা সফর করবে।
আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার-এর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সফরকালে অর্থ মন্ত্রণালয়, Bangladesh Bank এবং National Board of Revenue (এনবিআর)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেবে। বৈঠকগুলোতে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো, অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত
২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের সঙ্গে ৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার মনে করছে, ওই কর্মসূচির কিছু শর্ত—বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত ভর্তুকি হ্রাস এবং মূল্য সমন্বয়—বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ কারণে বিদ্যমান কর্মসূচি অব্যাহত না রেখে নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে পৃথক একটি অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৪.৫–৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা প্যাকেজ
সরকার আইএমএফের কাছে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার (৪.৫ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের নতুন ঋণ সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচির সম্ভাব্য মেয়াদ তিন থেকে চার বছর হতে পারে।
সরকারের মতে, এই অর্থায়নের লক্ষ্য হবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, তারল্য সংকট মোকাবিলা করা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্র
নতুন ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কারের বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা জোরদার করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
এছাড়া রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, এনবিআরের সক্ষমতা উন্নয়ন, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর মুদ্রানীতি পরিচালনার স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নীতিগত স্বাধীনতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হতে পারে।
অন্যদিকে, জ্বালানি খাতে ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া হতে পারে, যাতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রেখে আর্থিক চাপ কমানো সম্ভব হয়।
জুলাই সফরের গুরুত্ব: আগামী ১২ থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সফরে আইএমএফ প্রতিনিধিদল সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে। এসব বৈঠকে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো, সংস্কার কর্মপরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন রোডম্যাপ নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতি লাভ করলে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে একটি নতুন মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচির পথ উন্মুক্ত হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন একটি কর্মসূচি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক খাতের চাপ মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।