করপোরেট আগ্রাসনে পিষ্ট CMSME খাত: হুমকিতে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (CMSME) খাতের অবদান অনস্বীকার্য হলেও বর্তমানে তা এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বহুমুখী ব্যবসায়িক হস্তক্ষেপ, বাজার একচেটিয়াকরণ, অসম মূল্য প্রতিযোগিতা এবং নীতিনির্ধারণী সুবিধার অপব্যবহারের কারণে বাজার থেকে ক্রমশ ছিটকে পড়ছেন ছোট উদ্যোক্তারা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই 'করপোরেট আগ্রাসন' দেশের সম্পদ ও ব্যবসাকে গুটিকয়েক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বন্দি করে ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে

PostImage

করপোরেট আগ্রাসনে পিষ্ট CMSME খাত: হুমকিতে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য


দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (CMSME) খাতের অবদান অনস্বীকার্য হলেও বর্তমানে তা এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বহুমুখী ব্যবসায়িক হস্তক্ষেপ, বাজার একচেটিয়াকরণ, অসম মূল্য প্রতিযোগিতা এবং নীতিনির্ধারণী সুবিধার অপব্যবহারের কারণে বাজার থেকে ক্রমশ ছিটকে পড়ছেন ছোট উদ্যোক্তারা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই 'করপোরেট আগ্রাসন' দেশের সম্পদ ও ব্যবসাকে গুটিকয়েক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বন্দি করে ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

ঐতিহ্যবাহী পণ্যে করপোরেট থাবা ও আগ্রাসী বিপণন

​একসময় মুড়ি, চানাচুর, মসলা বা চালের মতো যেসব সাধারণ ও ঐতিহ্যবাহী পণ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করতেন, তা এখন বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানিগুলোর দখলে চলে গেছে। বিপুল পুঁজির জোরে এই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করে বাজার দখল করে, যা অর্থনীতিতে 'প্রেডেটরি প্রাইসিং' (Predatory Pricing) নামে পরিচিত। ছোট উদ্যোক্তারা এই আর্থিক ক্ষতি সইতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিপুল বিজ্ঞাপনের চাপ; গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করপোরেটদের কোটি কোটি টাকার প্রচারণার সামনে টিকতে পারছে না ক্ষুদ্র পুঁজির দেশীয় পণ্য।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব সংকটের প্রধান কারণসমূহ:

> বাজার একচেটিয়াকরণ (মনোপলি ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যে করপোরেট প্রবেশ)

> কাঁচামাল সিন্ডিকেট ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়

> আর্থিক বৈষম্য (ব্যাংক ঋণের জটিলতা ও প্লটের অভাব)

কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন ব্যয়ের অসমতা

​বড় শিল্প গ্রুপগুলো প্রায়শই কাঁচামালের পাইকারি বাজার বা আমদানির উৎস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে তৈরি হয় 'কাঁচামাল সিন্ডিকেট'। ছোট উদ্যোক্তাদের বাধ্য হয়ে বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের উৎপাদন খরচে। অন্যদিকে, বড় কারখানাগুলোতে 'ইকোনমিকস অব স্কেল' (Economies of Scale) বা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি হওয়ায় প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পুঁজির অভাবে ছোট কারখানাগুলো এই অসম খরচের প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে।

আর্থিক ও নীতিনির্ধারণী বৈষম্যের দেয়াল

​ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বড় করপোরেটদের সহজে হাজার কোটি টাকা ঋণ দিলেও, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জামানত বা নানা সনদের অজুহাতে সামান্য ঋণ দিতেও অনীহা প্রকাশ করে। এছাড়া বিসিক (BSCIC) বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বড় প্লটের সংখ্যা বেশি থাকায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট ছোট কারখানার জায়গা বা প্লটের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে করপোরেট আগ্রাসনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

​বিশেষজ্ঞদের মতে, এই করপোরেট আগ্রাসন কেবল ছোট ব্যবসায়ীদেরই ক্ষতি করছে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির ভিত দুর্বল করে দিচ্ছে:

  • সম্পদ ও আয়ের তীব্র বৈষম্য: দেশের সিংহভাগ মুনাফা মাত্র কয়েকটি বড় পরিবারের হাতে জমা হচ্ছে, যার ফলে ধনকুবেরের সংখ্যা বাড়লেও মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিলুপ্ত হচ্ছে এবং প্রান্তিক কারিগররা দিনমজুরে পরিণত হচ্ছেন।

  • মনোপলি বা একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি: বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকায় গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির পণ্যই চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কোম্পানিগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে এবং প্রতিযোগিতার অভাবে পণ্যের মান ধরে রাখার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ছে।

  • কর্মসংস্থান সংকোচন: বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প লোকবলে বিপুল উৎপাদন করে। ফলে হাজার হাজার ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যে পরিমাণ মানুষ বেকার হচ্ছে, বড় কোম্পানিগুলো সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না।

  • নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থার পঙ্গুত্ব (State Capture): অর্থনৈতিকভাবে অতি শক্তিশালী হয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ট্যাক্স, শুল্ক এবং আমদানি নীতি নিজেদের অনুকূলে প্রণয়ন করতে বাধ্য করে। পাশাপাশি তাদের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

  • নতুন উদ্ভাবন ও মেধার বিকাশ রোধ: তরুণ বা নতুন কোনো উদ্যোক্তা ভালো আইডিয়া নিয়ে এলে বড় কোম্পানিগুলো তা সস্তায় কিনে নেয় অথবা আগ্রাসী কৌশলে বাজার থেকে মুছে দেয়। ফলে নতুন প্রজন্ম উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস হারিয়ে কেবল করপোরেটদের অধীনে 'চাকরিজীবী' হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলছে।

পরিত্রাণের উপায় কী?

​অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে দেশে অ্যান্টি-মনোপলি আইন (একচেটিয়া ব্যবসা বিরোধী আইন) কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টেকসই করতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও জামানতবিহীন ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে সরকারি নীতিমালার সংস্কার জরুরি।

সংবাদ বিশ্লষক - এস গোস্বামী, সিএসবি ইউএসএ

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর