প্রতিবেশী, অংশীদার, বন্ধু: ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের স্থায়ী স্থাপত্য

ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে যখন মৈত্রী এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়, তখন তার কামরাগুলো শুধু যাত্রী বহন করে না—বয়ে নিয়ে যায় এক গভীর সম্পর্কের দৈনন্দিন বাস্তবতা। শিক্ষার্থীরা ভর্তি-পত্র হাতে, রোগীরা চেন্নাইয়ের হাসপাতালের পথে, ব্যবসায়ীরা নমুনা পণ্য নিয়ে যাত্রা করেন। ভারত ও বাংলাদেশের ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত—যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত—যেখানে ভূ-রাজনীতির বিমূর্ততা নেই; সেখানে আছে মানুষ, পণ্য, বিদ্যুৎ ও ঐতিহসিক গৌরবের স্মৃতি

PostImage

প্রতিবেশী, অংশীদার, বন্ধু: ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের স্থায়ী স্থাপত্য


ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে যখন মৈত্রী এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়, তখন তার কামরাগুলো শুধু যাত্রী বহন করে না—বয়ে নিয়ে যায় এক গভীর সম্পর্কের দৈনন্দিন বাস্তবতা। শিক্ষার্থীরা ভর্তি-পত্র হাতে, রোগীরা চেন্নাইয়ের হাসপাতালের পথে, ব্যবসায়ীরা নমুনা পণ্য নিয়ে যাত্রা করেন। ভারত ও বাংলাদেশের ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত—যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত—যেখানে ভূ-রাজনীতির বিমূর্ততা নেই; সেখানে আছে মানুষ, পণ্য, বিদ্যুৎ ও ঐতিহসিক গৌরবের স্মৃতি।

এই স্মৃতি ১৯৭১ সালে ফিরে যায়, যখন ভারত প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। তবে সম্পর্কের গল্পকে শুধু সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। গত পঞ্চাশ বছরে দুই প্রতিবেশী গড়ে তুলেছে এক বিস্তৃত অংশীদারিত্ব—যেখানে আছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ১৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করিডোর, যৌথ বিদ্যুৎ গ্রিড, আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ এবং এমন এক সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দুই দেশই নিজেদের বলে স্বীকৃতি দেয়—এবং তা যথার্থই।

অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, আর ভারত এশিয়ায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪.০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ১৫ বছর আগের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

ভারত রপ্তানি করে তুলার সুতা, কাপড় ও মসলা; বাংলাদেশ রপ্তানি করে চামড়া, পাট ও তৈরি পোশাক। ভারত প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশকে—যা বৈশ্বিকভাবে ভারতের সবচেয়ে বড় ঋণ সহায়তা। এসব অর্থ দিয়ে তৈরি হয়েছে সড়ক, রেল ও বন্দর অবকাঠামো।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে, যেখানে ৪ মিলিয়নের বেশি শ্রমিক কাজ করেন, ভারতীয় তুলার সুতা একটি অপরিহার্য উপাদান। নতুন রুপি-ভিত্তিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। পাশাপাশি ২০২১ সালে চালু হওয়া ইন্ডিয়া–বাংলাদেশ স্টার্টআপ ব্রিজ নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করছে।

বিদ্যুৎ জ্বালানি সহযোগিতা

খুলনার রামপালে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম বাস্তব উদাহরণ। ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্পটি ভারতের NTPC এবং বাংলাদেশের পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে। ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত–বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন (২০২৩ সালে চালু) জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিড—যেখানে নেপাল, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে—সেই বৃহৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ।

যোগাযোগ বিপ্লব

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ছয়টি আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে আগরতলা–আখাউড়া রেললাইন চালু হয়। তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন নিয়মিত চলাচল করছে। ২০২৪ সালে ভারত ৪২০টি রেলওয়ে ওয়াগন বাংলাদেশকে দিয়েছে।

খুলনা–মোংলা বন্দর রেললাইন আঞ্চলিক লজিস্টিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। পাঁচটি বাস রুট বড় শহরগুলোকে যুক্ত করেছে। ১৯৭২ সাল থেকে চালু থাকা ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ প্রোটোকল নদীপথে বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা

দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন পরিপক্ব ও সম্প্রসারিত। ২০২৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং চতুর্থ তিন বাহিনী বৈঠক। ভারত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ দিয়েছে।

যৌথ সামরিক মহড়া—Sampriti (স্থলবাহিনী) এবং Bongosagar (নৌবাহিনী)—পারস্পরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

২০১৪ সাল থেকে ৭,০০০-এর বেশি বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা এবং ১,২৫০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

মানবিক সম্পর্ক

২০২৪ সালে প্রায় ৪,৮২,০০০ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ভারতে গেছেন—যা ভারতের মোট মেডিকেল পর্যটকের ৫২ শতাংশ। কারণ হিসেবে রয়েছে ভৌগোলিক নিকটতা, ভাষাগত সহজতা (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে) এবং তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসা।

এয়ার ইন্ডিয়া ২০২৩ সালে বাংলাদেশ রুটে ফ্লাইট ৩ থেকে বাড়িয়ে ১৪টি সাপ্তাহিক ফ্লাইট করেছে।

সাংস্কৃতিকভাবে দুই দেশ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। বাংলা ভাষা দুই দেশের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে।

ভারত প্রতিবছর ৩০০টি ICCR স্কলারশিপ প্রদান করে। ২০২২–২৩ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা স্কলারশিপ স্কিম আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে।

সব ঋতুর সম্পর্ক

পঞ্চাশ বছরে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক—আরও গভীর, আরও কার্যকর এবং আরও মানবিক।

বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় সীমান্ত পেরিয়ে। ট্রেন চলে নির্ধারিত সময়ে। শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করে। রোগীরা সুস্থ হয়ে ফিরে যান।

১৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য, ৮ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন ঋণ, ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিনিময়, ছয়টি রেল সংযোগ এবং বছরে অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি চিকিৎসা যাত্রা—এসব কেবল সংখ্যার গল্প নয়।

আসল গল্পটি মৈত্রী এক্সপ্রেসে—যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয় যে পাশের দেশই তাদের সুযোগ, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের জায়গা।

এটাই যে কোনো টেকসই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি। আর ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ভবিষ্যৎ এখনো আরও সম্ভাবনাময়।

লেখক - এস গোস্বামী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চিন্তক।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর