স্বৈরশাসক না কি উন্নয়নের রূপকার—ইতিহাস কী বলে?

বিশ্ব ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যেসব রাষ্ট্রপ্রধান দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন এবং যাদের ফ্যাসিস্ট বা ডিক্টেটর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই তারাই নিজ নিজ দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি নির্মাণ করেছেন।

PostImage

স্বৈরশাসক না কি উন্নয়নের রূপকার—ইতিহাস কী বলে?


দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপ্রধানরা ফ্যাসিস্ট বা ডিক্টেটর হিসেবে অভিযুক্ত হলেও তারাই উন্নয়নের রূপকার ছিল ঐতিহাসিক বাস্তবতা

বৈশ্বিক রাজনীতিতে রেজিম চেঞ্জের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে। যেসব রাষ্ট্রপ্রধান দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন এবং যাদের ডিক্টেটর বা ফ্যাসিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই তারাই নিজ নিজ দেশের উন্নয়নের প্রধান রূপকার ছিলেন। ইতিহাস বলছে যেসব নেতা তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে প্রতিহত করতে পেরেছেন তারাই দেশকে উন্নয়নের মাইলফলকে পৌঁছে দিয়েছেন।

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে একটি গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের উন্নয়ন কি থমকে গেল নাকি নতুন কোনো সম্ভাবনার জন্ম নেবে।

গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি ও বিরোধী মত দমনের মতো নানা অভিযোগ থাকলেও বাস্তবতায় দেখা যায় যোগাযোগ অবকাঠামো নগরায়ন বিদ্যুৎ শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ প্রায় সব খাতে একটি সুপরিকল্পিত উন্নয়ন কাঠামো গড়ে উঠেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছিল তা ছিল উন্নত বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ।

আন্তর্জাতিক চাপ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং শিক্ষার্থীদের যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেসব ইস্যু সামনে আনা হয়েছিল তার বড় একটি অংশ বাস্তবতার চেয়ে প্রপাগান্ডানির্ভর ছিল বলে বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন।

৫ আগস্ট পরবর্তী ১৭ মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অর্থনীতি প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় খাতগুলোতে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তা জনমনে শঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিশ্বের অধিকাংশ গণঅভ্যুত্থানে পতিত দীর্ঘমেয়াদি শাসকদের ক্ষেত্রেও শেখ হাসিনার মতো একই ধরনের অভিযোগ ও রাজনৈতিক ভাষ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বৈরাচার মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে।

সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া এর উজ্জ্বল উদাহরণ। আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্থপতি লি কুয়ান ইউ তার শাসনামলে বিরোধী দল দমন বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং অপারেশন কোল্ডস্টোরের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আটকের মতো অভিযোগের মুখোমুখি হন। তার কঠোর শাসনব্যবস্থার কারণে তাকে Benevolent Dictator বলা হতো। এমনকি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিআইএ ষড়যন্ত্র করেছিল যা তিনি পরে প্রকাশ করেন। সব বাধা উপেক্ষা করেই তিনি সিঙ্গাপুরকে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন।

মালয়েশিয়ার আধুনিকায়নের রূপকার মাহাথির মোহাম্মদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়। পশ্চিমা শক্তি ও জর্জ সোরোসের মতো প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে বিরোধী আন্দোলনে বিপুল অর্থায়ন করে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তবে ততদিনে মালয়েশিয়ার উন্নয়নের ভিত তিনি শক্ত করে গড়ে দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলেও বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে ব্যর্থ হন। ফলে এই দুই দেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের প্রথম ভাগকে স্বর্ণযুগ বলা হতো। সে সময় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। শিক্ষা স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল। পরবর্তীতে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে দুজাইল ও কুর্দি গণহত্যাসহ গুরুতর অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত হন এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ সত্য হলেও অনেক অভিযোগই ছিল আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থকেন্দ্রিক চাপের ফল।

লিবিয়ার গাদ্দাফি ৪২ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশটিকে আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। সাক্ষরতার হার ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৩ শতাংশে পৌঁছায়। নবদম্পতিদের আর্থিক সহায়তা নবজাতকের জন্য মাতৃত্ব ভাতা এবং বিশাল বৈদেশিক রিজার্ভ লিবিয়াকে একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রে রূপ দিয়েছিল। গ্রেট ম্যান মেইড রিভার প্রকল্প মরুভূমিকে সেচের আওতায় এনে বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। অথচ একই অভিযোগের ধারাবাহিকতায় ন্যাটো অভিযানে তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। তার পতনের পর লিবিয়া আজ একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র।

বিশ্বব্যাপী রেজিম চেঞ্জের কৌশল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় দীর্ঘ সময়ের শাসনব্যবস্থাই মূল লক্ষ্যবস্তু। লি কুয়ান ইউ ও মাহাথির মোহাম্মদ ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে সক্ষম হলেও সাদ্দাম ও গাদ্দাফি ব্যর্থ হন। ইতিহাসে দেখা যায় যাদের স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট বলা হয়েছে তারাই অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছেন।

এই বাস্তবতার আলোকে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন শেখ হাসিনাও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশনারি অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

চীন রাশিয়া থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য ফ্রান্স ও জার্মানির ইতিহাসেও দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বই উন্নয়ন বা উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অভিজ্ঞ দেশপ্রেমিক এবং কঠোর নেতৃত্ব ছাড়া একটি রাষ্ট্রকে টেকসই উন্নয়নের পথে নেওয়া কঠিন। স্বৈরশাসন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগ অনেক সময়ই শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে উন্নয়নশীল ও সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়।

শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তার দলের বাইরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার প্রতি যে আস্থা ছিল তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে। অপরদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে দায়মুক্তি নিরাপত্তাহীনতা মব সন্ত্রাস এবং অর্থনৈতিক অনিয়ম মানুষের মধ্যে গভীর অনাস্থা সৃষ্টি করেছে।

সার্বিকভাবে বলা যায় বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কূটকৌশলের ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পতনের মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাকেই বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।

এস গোস্বামী :  রাজনৈতিক বিশ্লেষক