জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বাড়ছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্বেগ
বিশ্ব যখন দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই আধুনিক প্রযুক্তি কেবল উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জঙ্গি ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলিও নীরবে এআই ব্যবহার শুরু করেছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সদস্য নিয়োগ, ভুয়া প্রচারণা, ডিপফেক কনটেন্ট এবং সাইবার কার্যক্রমে এআইয়ের ব্যবহার সহিংস মতাদর্শ ছড়ানোর গতি ও পরিসর বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে—যা বিশ্বজুড়ে সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বাড়ছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্বেগ
বিশ্বজুড়ে সরকার, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও গবেষকরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যস্ত, তখন জঙ্গি ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলিও ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সীমিত পরিসরে হলেও এআই ব্যবহারের মাধ্যমে এসব গোষ্ঠী তাদের প্রভাব, প্রচারণা ও কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এআই চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহ, প্রচারণা বিস্তার এবং সাইবার কার্যক্রমের ধরন আমূল বদলে দিতে পারে। জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে খুব দ্রুত বাস্তবসম্মত ছবি, ভিডিও, অডিও ও লেখা তৈরি করা সম্ভব—যা আগে এত দ্রুত ও ব্যাপকভাবে করা কল্পনাও করা যেত না।
গত মাসে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-সমর্থিত একটি অনলাইন ফোরামে দেওয়া এক পোস্টে সমর্থকদের এআইকে তাদের কর্মকাণ্ডের অংশ করার আহ্বান জানানো হয়। পোস্টটিতে এআই ব্যবহারের সহজলভ্যতার কথা উল্লেখ করা হয় এবং স্পষ্টভাবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সেই আশঙ্কাকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়—যে এআই নতুন সদস্য নিয়োগে সহায়ক হতে পারে।
একসময় ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা ইসলামিক স্টেট এখন বিভিন্ন সহযোগী গোষ্ঠীর একটি বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা থেকেই আইএস এখন এআইয়ের দিকে ঝুঁকছে।
সীমিত অর্থ ও সংগঠনিক কাঠামো থাকা জঙ্গি গোষ্ঠী—অথবা একক কোনো উগ্রপন্থী ব্যক্তিও—এআই ব্যবহার করে সহজেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কম খরচে প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি, ডিপফেক ছবি বা ভিডিও বানানো এবং একাধিক ভাষায় বার্তা অনুবাদ করে তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
“এআই যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য কাজ অনেক সহজ করে দেয়,” বলেন জন লালিবার্তে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির সাবেক গবেষক ও বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ারভেক্টরের প্রধান নির্বাহী। “অল্প সম্পদের ছোট গোষ্ঠীগুলিও এআই ব্যবহার করে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।”
গবেষকদের মতে, চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পরপরই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো এগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব এআই-নির্ভর কনটেন্ট আরও উন্নত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের সহায়তায় এই ভুয়া কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জনমত বিভ্রান্ত করতে, আবেগ উসকে দিতে এবং সমাজে মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে। ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধের সময় এআই দিয়ে তৈরি আহত ও পরিত্যক্ত শিশুদের ভুয়া ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং বাস্তব তথ্যকে আড়াল করে দেয়। এসব ছবি মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি গোষ্ঠী ও পশ্চিমা দেশগুলোর ইহুদিবিরোধী ঘৃণাগোষ্ঠী সদস্য নিয়োগে ব্যবহার করে।
গত বছর রাশিয়ায় একটি কনসার্ট ভেন্যুতে হামলায় প্রায় ১৪০ জন নিহত হওয়ার পরও একই চিত্র দেখা যায়। আইএস-ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠীর দাবি করা ওই হামলার পর এআই-তৈরি প্রচারণামূলক ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, যার উদ্দেশ্য ছিল নতুন সদস্য সংগ্রহ ও সহিংসতাকে মহিমান্বিত করা।
SITE ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আইএস-সংযুক্ত নেটওয়ার্কগুলো এআই ব্যবহার করে তাদের নেতাদের কণ্ঠ নকল করে ধর্মীয় বাণী পাঠের ডিপফেক অডিও তৈরি করেছে। পাশাপাশি, এআই দিয়ে দ্রুত বিভিন্ন ভাষায় বার্তা অনুবাদ করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, এআই নিজে নিরপেক্ষ প্রযুক্তি হলেও এর অপব্যবহার বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই হুমকি মোকাবিলায় সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন—যাতে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করা, অনলাইন নিয়োগ কার্যক্রম ঠেকানো এবং জনগণের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো যায়।