অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
মার্কিন এশীয় ভোটারদের সমর্থনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা বড় ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের কাছে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবা বড় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠেছে। নতুন জরিপে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সমর্থন কমার চিত্র উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এশীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাব নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়কে কেন্দ্র করে এই জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ বাড়ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, নরক সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ এবং এএপিআই ডেটার যৌথ জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনীতি পরিচালনার বিষয়ে এশীয় আমেরিকান, নেটিভ হাওয়াইয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের বংশোদ্ভূত প্রাপ্তবয়স্কদের সমর্থন কমেছে। নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জরিপটি ২০২৬ সালের ৮ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ২৩ জন এশীয় আমেরিকান, নেটিভ হাওয়াইয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের বংশোদ্ভূত প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। জরিপের নমুনা নির্বাচন করা হয়েছিল সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি গবেষণা প্যানেল থেকে। ফলাফলে অর্থনীতিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বিষয়গুলোর একটি হিসেবে দেখা গেছে। প্রায় ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা অর্থনীতিকে নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। প্রায় ৮০ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রায় ৭০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জরিপটির সামগ্রিক নমুনাগত ত্রুটির সীমা ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট।
জরিপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমর্থনের হার প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন প্রায় এক-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের শুরু থেকে এশীয় বংশোদ্ভূত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমোদনের হার প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। এই ফলাফল দেখায়, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে জরিপের তথ্য দিয়ে সব এশীয় ভোটার একই ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের দৈনন্দিন খরচ। বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যাতায়াত এবং স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় অনেক পরিবারের বাজেটে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক চ্যালেঞ্জ। আয় বাড়লেও যদি প্রয়োজনীয় ব্যয় আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে পরিবারের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে নির্বাচনের আগে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্যসেবাও জরিপে উঠে আসা অন্যতম প্রধান ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম এবং ওষুধের খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় ব্যয়ের ক্ষেত্র। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কোন দল কী ধরনের নীতি গ্রহণ করবে, তা নিয়ে ভোটারদের আগ্রহ রয়েছে। এএপি ডেটা ও নরকের জরিপে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তুলনামূলক বেশি আস্থার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে ডেমোক্র্যাট দলের সামগ্রিক ভাবমূর্তি নিয়েও উত্তরদাতাদের মধ্যে মিশ্র মনোভাব রয়েছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোনো নীতিতে একটি দলকে বেশি বিশ্বাস করা মানেই সেই দলের সব কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন দেওয়া নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশি-আমেরিকানরাও রয়েছেন। তাঁদের অনেকের জন্য আবাসন, কর্মসংস্থান, ব্যবসার ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিমা এবং অভিবাসননীতি দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এই জরিপে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের মতামত আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তাই জরিপের ফলাফলকে সরাসরি বাংলাদেশি-আমেরিকানদের রাজনৈতিক সমর্থনের পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক হবে না। বরং এটি বৃহত্তর এশীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও রাজনৈতিক মনোভাব সম্পর্কে ধারণা দেয়।
আগামী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কংগ্রেসের সদস্যরা করনীতি, সরকারি ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং অভিবাসনসংক্রান্ত আইন প্রণয়নে ভূমিকা পালন করেন। ফলে প্রার্থীদের নীতিগত অবস্থান, পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এশীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়গুলো তাই শুধু একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বৃহত্তর জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত।
জরিপে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে। প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা নির্বাচনী প্রার্থীদের বিষয়ে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়া নিয়ে অত্যন্ত বা খুব উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন। ভোট দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং নির্বাচনের ফল নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের আশঙ্কাও তাঁদের উদ্বেগের অংশ। এসব তথ্য নির্বাচনের আগে নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র যাচাই করা, প্রার্থীদের বক্তব্যের সত্যতা পরীক্ষা করা এবং সরকারি নির্বাচন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরে।
নতুন জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় বংশোদ্ভূত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বেগ এবং ট্রাম্পের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি কম সমর্থনের চিত্র পাওয়া গেছে। তবে এই জরিপ নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে না এবং কোনো রাজনৈতিক দল নিশ্চিতভাবে জয়ী হবে—এমন সিদ্ধান্তও দেয় না। আগামী ৩ নভেম্বর ভোটারদের অংশগ্রহণ, স্থানীয় প্রার্থীদের অবস্থান এবং বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁদের মূল্যায়নই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





