অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
ডিজেলের বাড়তি দামে চাপে মার্কিন কৃষক, ট্রাম্পের গ্রামীণ ভোটে প্রভাবের আশঙ্কা
ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক চাপ গ্রামীণ ভোটারদের মনোভাব ও রিপাবলিকানদের নির্বাচনী কৌশলে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফসল কাটার গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে জ্বালানির বাড়তি খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশটির বিভিন্ন কৃষি অঞ্চলের কৃষকেরা। বিশেষ করে কানসাসসহ মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপ্রধান এলাকায় এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই অর্থনৈতিক চাপ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির গ্রামীণ ভোটের হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানসাসে ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬.৩০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। ফসল কাটার মৌসুমে কৃষকদের ট্রাক্টর, ফসল কাটার যন্ত্র, পরিবহন ট্রাক এবং অন্যান্য কৃষিযন্ত্র চালাতে প্রচুর ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু জমিতে কাজ করার খরচ নয়, উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ব্যয়ও বেড়ে যায়। কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ বীজ, সার, যন্ত্রপাতি এবং শ্রমিকের খরচও তাঁদের হিসাবের অংশ।
কৃষিকাজে জ্বালানির ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। নির্দিষ্ট সময়ে ফসল কাটতে না পারলে আবহাওয়া, ফসলের গুণমান এবং বাজারমূল্যের কারণে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। এ কারণে ডিজেলের দাম বেশি হলেও অনেক কৃষককে প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে তাঁদের লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কৃষিপণ্যের দাম প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ের এই অতিরিক্ত চাপ সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু কৃষকের খামারে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং বাজারে সরবরাহের বড় অংশ ডিজেলচালিত ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি উৎপাদন ও পরিবহনের ব্যয় বাড়লে সময়ের সঙ্গে কিছু পণ্যের খুচরা দামেও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ডিজেলের দাম বাড়লেই সব খাদ্যপণ্যের দাম একই হারে বাড়বে, এমন নয়। পণ্যের সরবরাহ, চাহিদা, পরিবহন চুক্তি এবং ব্যবসায়ীদের ব্যয় সামাল দেওয়ার কৌশলও চূড়ান্ত দামে ভূমিকা রাখে।
এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ ও কৃষিপ্রধান এলাকার অনেক ভোটার দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের সমর্থন দিয়ে আসছেন। কিন্তু জ্বালানি, খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়ে গেলে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ী নির্বাচনের আগে ব্যয় কমানোর প্রত্যাশা করেছিলেন, তাঁদের কাছে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প কৃষকদের সমর্থন ধরে রাখতে কানসাসের মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলে প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁর দল এমন কিছু ভোটারকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যাঁদের কাছে কৃষি খাতের ব্যয়, বাজার পরিস্থিতি এবং জীবনযাত্রার খরচ গুরুত্বপূর্ণ। তবে গ্রামীণ ভোটারদের মনোভাব শুধু ডিজেলের দামের ওপর নির্ভর করে না। কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য, সরকারি সহায়তা, বাণিজ্যনীতি, স্বাস্থ্যসেবার খরচ এবং স্থানীয় প্রার্থীদের অবস্থানও তাঁদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর আগে কৃষি ও পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে রঙিন ডিজেলের ব্যবহারসংক্রান্ত ফেডারেল বিধি প্রয়োগে সাময়িক শিথিলতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই জ্বালানি সাধারণত নির্দিষ্ট কৃষি ও অন্যান্য অফ-রোড কাজে করছাড়ের সুবিধায় ব্যবহৃত হয়। প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ফসল পরিবহনের সময় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট চালকদের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করা। তবে এই পদক্ষেপের সুবিধা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে জ্বালানির প্রাপ্যতা, সংশ্লিষ্ট নিয়ম এবং বাস্তবে কৃষকেরা কতটা সাশ্রয় করতে পারছেন তার ওপর।
জ্বালানির বাজারে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরবরাহে বিঘ্ন, সংঘাত এবং জ্বালানি বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা ডিজেলের দাম বাড়াতে পারে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, মজুত এবং পরিবহন পরিস্থিতির মতো একাধিক বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। ফলে শুধু একটি সরকারি সিদ্ধান্ত বা একটি আন্তর্জাতিক ঘটনার কারণে ডিজেলের পুরো মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা ভোটারদের কাছে নিজেদের নীতির কার্যকারিতা তুলে ধরা। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে কৃষকদের অসন্তোষ সরাসরি কোন দলের পক্ষে ভোটে রূপ নেবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের বাড়তি দাম কৃষি খাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ফসল কাটার মৌসুমে কৃষকদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে। একই সময়ে নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এই সমস্যা রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। কৃষকদের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যয়-সহায়তা এবং জ্বালানির বাজারে স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও, শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তাঁদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রার্থীদের নীতিগত অবস্থানের ওপর।





