যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতির ৫৪০ দিনের সুবিধা বাতিল, নবায়নে দেরি হলে চাকরি হারানোর শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতিপত্র নবায়নের অপেক্ষায় থাকা অনেক অভিবাসীর জন্য বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সময়মতো অনুমোদন না এলে বন্ধ হতে পারে চাকরি।
যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নবায়নের আবেদন বিবেচনাধীন থাকলে সর্বোচ্চ ৫৪০ দিন পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার যে স্বয়ংক্রিয় সুবিধা ছিল, তা বন্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে দেশটির সরকার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী বিধির মাধ্যমে চালু হওয়া এই পরিবর্তন ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর চূড়ান্ত বিধি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট শ্রেণির বিদেশি কর্মীরা শুধু নবায়নের আবেদন জমা দেওয়ার কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাবেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এবং নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবার বিধি অনুযায়ী, নতুন সিদ্ধান্তটি মূলত কাজের অনুমতিপত্র নবায়নের নির্দিষ্ট শ্রেণির আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আগে অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যথাযথভাবে নবায়নের আবেদন জমা দিলে এবং আবেদন নিষ্পত্তি না হলে যোগ্য আবেদনকারীরা নির্দিষ্ট শর্তে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে পারতেন। ২০২২ সালে এই সময়সীমা সর্বোচ্চ ৫৪০ দিন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সুবিধাটি স্থায়ী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে নতুন আবেদনকারীদের জন্য সেই স্বয়ংক্রিয় সুবিধা বন্ধ করা হয়। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত চূড়ান্ত বিধি আগের সিদ্ধান্তটিকেই বহাল রেখেছে।
দেশটির সরকারের যুক্তি, কাজের অনুমতির মেয়াদ বাড়ানোর আগে আবেদনকারীর যোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু নবায়নের আবেদন জমা পড়েছে বলে দীর্ঘ সময় কাজের অনুমতি বহাল রাখা হলে যাচাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই কেউ কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। নতুন বিধির মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কমানো এবং অনুমতিপত্র নবায়নের ক্ষেত্রে যাচাইপ্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সব বিদেশি কর্মীর কাজের অনুমতি একযোগে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। যেসব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে নতুন বিধি প্রযোজ্য, তাঁদের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার রসিদ বা আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকার তথ্য একাই মেয়াদোত্তীর্ণ অনুমতিপত্রের বৈধতা বাড়াবে না। আবার ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবরের আগে যেসব অনুমতিপত্রের স্বয়ংক্রিয় মেয়াদ বৃদ্ধি কার্যকর হয়েছিল, সেগুলোর বৈধতা এই বিধির কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না। আইন বা পৃথক সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অনুমোদিত কিছু ব্যতিক্রমও বহাল রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের একটি অংশের ওপর। বিশেষ করে যেসব পরিবারের সদস্যরা নির্ভরশীল অভিবাসন মর্যাদার ভিত্তিতে কাজের অনুমতিপত্র নিয়ে চাকরি করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নবায়নে বিলম্ব হলে আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অনেক পরিবারও উদ্বেগের মুখে পড়তে পারেন।
বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে এইচ-১বি কর্মীদের নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বামী বা স্ত্রীর কাজের অনুমতি। যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি কর্মসূচির আওতায় কাজ করা বিদেশি কর্মীদের কিছু স্বামী বা স্ত্রী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে কাজের অনুমতিপত্রের জন্য আবেদন করতে পারেন। তাঁদের অনেকেই স্থায়ী বসবাসের অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলাকালে চাকরি করেন। অনুমতিপত্রের নবায়ন আটকে গেলে এবং পুরোনো অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে নতুন নিয়মের আওতায় পড়া ব্যক্তিদের কাজ বন্ধ রাখতে হতে পারে। এতে পরিবারের আয় কমে যাওয়া, চাকরির ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়া এবং নিয়োগদাতার কর্মী ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নবায়নের আবেদন কখন জমা দেওয়া যাবে, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এইচ-৪ শ্রেণির নির্ভরশীলদের কাজের অনুমতিপত্রের নবায়নের আবেদন সাধারণত বর্তমান অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার সুযোগ থাকে। এ ক্ষেত্রে মূল এইচ-১বি কর্মীর অবস্থান বা মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনেও বিলম্ব হলে নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যের নবায়ন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে। তবে এই ১৮০ দিনের বিষয়টি নির্দিষ্ট শ্রেণির আবেদনকারীদের নিয়ম; এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সব বিদেশি কর্মীর জন্য একই সাধারণ সময়সীমা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে নির্দিষ্ট ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে থাকা শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতিপত্র নবায়নের ক্ষেত্রে আলাদা বিধি কার্যকর রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে অভিবাসন আইনজীবীর বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, যোগ্য শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে সময়মতো আবেদন করলে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের স্বয়ংক্রিয় মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধা পেতে পারেন। ফলে ৫৪০ দিনের সাধারণ সুবিধা বন্ধের সিদ্ধান্তকে তাঁদের জন্যও সব ধরনের মেয়াদ বৃদ্ধির অবসান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
সিদ্ধান্তটি নিয়ে আইনি বিতর্কও রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালত সাতজন আবেদনকারীর পক্ষে অন্তর্বর্তী প্রতিকার দিয়েছিলেন। ওই মামলায় তাঁদের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের বিধি প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। তবে আদালতের সেই প্রতিকার দেশজুড়ে সব আবেদনকারীর জন্য কার্যকর হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো আদালতের আদেশ বা বিশেষ ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ছেন কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
নতুন বিধির ফলে নিয়োগদাতাদেরও কর্মীদের কাজের অনুমতির মেয়াদ ও নবায়নের অবস্থা আরও সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে শুধু নবায়নের আবেদন জমা দেওয়ার প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে কাজে বহাল রাখা যাবে কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর আবেদন কোন শ্রেণির, কখন জমা দেওয়া হয়েছে এবং কোনো ব্যতিক্রম প্রযোজ্য কি না—এসব বিষয়ের ওপর। ভুলভাবে অনুমতি আছে ধরে নিয়ে কাজ চালিয়ে গেলে কর্মী ও নিয়োগদাতা উভয়ের জন্যই আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্তমান কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নবায়নের আবেদন করা এবং আবেদনের অগ্রগতি নিয়মিত দেখা। তবে আগেভাগে আবেদন করলেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কাজ চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে—এমন ধারণা করা উচিত নয়। যাঁদের অনুমতির মেয়াদ শিগগির শেষ হবে, তাঁদের নিজস্ব অভিবাসন শ্রেণি অনুযায়ী সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সার্বিকভাবে, ৫৪০ দিনের স্বয়ংক্রিয় মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধা বন্ধের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট শ্রেণির বিদেশি কর্মীদের চাকরির ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এর প্রভাব সবার জন্য এক নয়। আবেদন জমা দেওয়ার তারিখ, অনুমতির ধরন, সংশ্লিষ্ট অভিবাসন মর্যাদা এবং আইনি ব্যতিক্রমের ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে কারা নতুন বিধির আওতায় পড়বেন





