বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড আবেদন স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র সরকার

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্তে মাইক্রোসফটসহ আটটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন থেমে গেছে, চাপে পড়েছে অভিবাসন ও চাকরির বাজার।

বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড আবেদন স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র সরকার

বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ড আবেদন স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র সরকার


যুক্তরাষ্ট্র সরকার মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনিসহ আটটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের পথের গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্রম অনুমোদন কার্যক্রম স্থগিত করেছে। বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেওয়া হয়। দেশটির প্রশাসন বলছে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের জন্য চাকরির সুযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এই পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য। 

যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের স্থায়ী শ্রম অনুমোদন কার্যক্রমটি সাধারণত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মীকে স্থায়ীভাবে নিয়োগের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে গ্রিন কার্ডের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করতে চাইলে প্রমাণ করতে হয় যে সংশ্লিষ্ট পদে উপযুক্ত, আগ্রহী ও সহজলভ্য কোনো মার্কিন কর্মী নেই। ফলে এই কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের পথে থাকা বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সব ধরনের ভিসা সরাসরি বাতিল হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারল্যান্ড এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রকাশ করেন। শ্রম বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন কোনো স্থায়ী শ্রম অনুমোদনের আবেদন গ্রহণ করা হবে না এবং যেসব আবেদন ইতোমধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সেগুলোর প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হবে না। মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবির ক্ষেত্রে চলমান একাধিক ফেডারেল তদন্তের কথাও কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। 

প্রশাসনের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিদেশি কর্মী নিয়োগের পদ্ধতি। কর্মকর্তারা দাবি করছেন, কিছু প্রতিষ্ঠান এমনভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করেছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য থাকা চাকরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মাইক্রোসফটকে ঘিরে প্রশাসন অভিযোগ তুলেছে যে প্রতিষ্ঠানটি একদিকে বিপুলসংখ্যক মার্কিন কর্মী ছাঁটাই করেছে, অন্যদিকে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য অভিবাসন সুবিধা ব্যবহার করেছে। এসব অভিযোগ এখন সরকারি তদন্ত ও পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে। 

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তোলা অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। এখন পর্যন্ত এগুলো সরকারি অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্তের কথা এই ঘোষণায় বলা হয়নি। মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। 

এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের ওপর, বিশেষ করে যারা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছেন। প্রযুক্তি খাতের বহু কর্মী প্রথমে অস্থায়ী কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে পরে নিয়োগকর্তার সহায়তায় স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেন। সংশ্লিষ্ট শ্রম অনুমোদন ধাপ আটকে গেলে তাদের পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যাদের বর্তমান কর্মসংস্থানভিত্তিক অবস্থানের সময়সীমা শেষ হওয়ার দিকে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। 

এই পদক্ষেপের সঙ্গে শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। বর্তমান প্রশাসন দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বারবার বলছে। এর ফলে বিদেশি কর্মী নিয়োগ, কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসন এবং স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন—এই তিন ক্ষেত্রেই সরকারি নজরদারি আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। 

একই ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও তদন্তের কথা জানানো হয়েছে। হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ মোট নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকদের মজুরি কমানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শ্রম বিভাগের মহাপরিদর্শকের কার্যালয় জানিয়েছে, এসব তদন্তের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য ও নথি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসন-সংশ্লিষ্টদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, স্থগিতাদেশ কতদিন কার্যকর থাকবে এবং এর আওতায় থাকা কর্মীদের চলমান আবেদনের ভবিষ্যৎ কী হবে। আপাতত ঘোষণায় নির্দিষ্ট কোনো শেষ তারিখ জানানো হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের প্রবণতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। 

আজকের ঘোষণাটি তাই শুধু কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন, কর্মসংস্থান এবং বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি পরিণতি তদন্ত ও পরবর্তী সরকারি বা আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর