২০২৭ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবার পাসপোর্ট আবেদন হবে সম্পূর্ণ অনলাইনে, ঘরে বসেই সহজে
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবার পাসপোর্ট আবেদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে, ২০২৭ সালে ঘরে বসেই আবেদন, ছবি, ফি পরিশোধ ও অগ্রগতি জানার সুবিধা মিলবে।
২০২৭ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবার পাসপোর্ট আবেদন হবে সম্পূর্ণ অনলাইনে, ঘরে বসেই সহজে
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রথমবার পাসপোর্ট করার দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর প্রথমবার পাসপোর্টের আবেদন পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়ার নতুন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদনকারীকে আর আগের মতো কাগজের আবেদনপত্র ছাপিয়ে, নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদন করার প্রয়োজন হবে না। নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো ঘরে বসে আবেদন করা, ছবি দেওয়া, অর্থ পরিশোধ করা এবং আবেদনের অগ্রগতি জানা সহজ করা।
২৯ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে নতুন সরকারি সেবাকেন্দ্র চালুর অনুষ্ঠানে রুবিও প্রথমবার পাসপোর্ট আবেদনের নতুন ব্যবস্থা প্রদর্শন করেন। তিনি জানান, আগামী বছর থেকে আমেরিকানরা প্রথম পাসপোর্টের আবেদন সম্পূর্ণ অনলাইনে করতে পারবেন। তবে একই বক্তব্যে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অধিকাংশ আমেরিকান যেন পাসপোর্ট বা পাসপোর্ট কার্ডের আবেদন এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে করতে পারেন, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। অর্থাৎ নির্দিষ্টভাবে সবার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিনে ব্যবস্থা চালু হবে এমন ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।
নতুন ব্যবস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নতুন একক অনলাইন সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হবে। এই সেবাকেন্দ্রের উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি সেবার জন্য আলাদা আলাদা সরকারি ওয়েবসাইটে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন কমানো। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৯ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি নির্বাহী আদেশও জারি করেছেন। আদেশে বিভিন্ন সরকারি সেবা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্রবেশদ্বারের মাধ্যমে সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ পরিচয় যাচাইয়ের জন্য সরকারি পরিচয় ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন সেবাকেন্দ্রের সংযোগ করার নির্দেশ রয়েছে।
রুবিওর প্রদর্শিত ব্যবস্থায় আবেদনকারী প্রথমে নিজের সরকারি পরিচয় ব্যবহার করে প্রবেশ করবেন। এরপর সরকারের কাছে আগে থেকেই থাকা নির্দিষ্ট তথ্য আবেদনপত্রে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ফলে একই তথ্য বারবার হাতে লিখে দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। প্রদর্শনীতে আবেদনকারীর নাম ও ঠিকানা আগে থেকেই দেখানো হয়েছিল। তবে কোন কোন তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে এবং কোন তথ্য আবেদনকারীকে নিজে দিতে হবে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত নির্দেশনা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ছবি তোলার পদ্ধতি। রুবিও দেখিয়েছেন, আবেদনকারী নিজের মুঠোফোন বা ব্যক্তিগত যন্ত্র ব্যবহার করে ঘরেই ছবি তুলতে পারবেন। আগে যেভাবে ছবি তোলার জন্য দোকান বা নির্দিষ্ট ছবি তোলার স্থানে যেতে হতো, নতুন ব্যবস্থায় সেই প্রয়োজন কমে যাবে। নিজের যন্ত্রে থাকা উপযুক্ত ছবিও ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে বলে প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে। ছবি পছন্দ না হলে নতুন ছবি তোলার সুযোগও দেখানো হয়। তবে ছবির ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত নিয়ম মানতেই হবে। মুখমণ্ডল পরিবর্তনকারী কৃত্রিম ছাঁকনি বা পরিবর্তিত ছবি গ্রহণযোগ্য হবে না।
আবেদনের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাও অনলাইনে করার কথা বলা হয়েছে। রুবিওর প্রদর্শনীতে আবেদন পূরণের পর সরাসরি অর্থ পরিশোধের ধাপ দেখানো হয়। একই সঙ্গে আবেদন কোথায় আছে এবং কখন নাগাদ পাসপোর্ট পৌঁছাতে পারে, সে সম্পর্কেও উন্নত তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। রুবিও বিশেষভাবে বলেছেন, আবেদনকারীরা আবেদনের অবস্থার তাৎক্ষণিক তথ্য এবং সম্ভাব্য পৌঁছানোর তারিখ জানতে পারবেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। নতুন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। বর্তমানে প্রথমবার প্রাপ্তবয়স্কদের পাসপোর্টের আবেদন করতে হলে নির্ধারিত আবেদন গ্রহণ কেন্দ্রে সশরীরে উপস্থিত হতে হয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী প্রথমবার প্রাপ্তবয়স্ক পাসপোর্টের জন্য নির্দিষ্ট আবেদনপত্র পূরণ করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ, পরিচয়পত্র, ছবি ও অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিতে হয়। আবেদন গ্রহণকারী কর্মকর্তা পরিচয় যাচাই করেন, প্রয়োজনীয় শপথ গ্রহণ করান এবং আবেদনপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
বর্তমানে প্রথমবার প্রাপ্তবয়স্ক পাসপোর্টের মূল আবেদনপত্রের নাম ডিএস-১১। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রথমবার পাসপোর্টের আবেদনকারীকে এই আবেদনপত্র ব্যবহার করতে হয়। ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরাও একই আবেদনপত্র ব্যবহার করে এবং তাদের আবেদন বর্তমানে অবশ্যই সশরীরে করতে হয়। তবে নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় শিশুদের জন্য ঠিক কী নিয়ম থাকবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রকাশিত হয়নি। তাই ১৬ বছরের কম বয়সীদের নতুন ব্যবস্থার বাইরে রাখা হবে এমন কথা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।
বর্তমান খরচের ক্ষেত্রেও প্রচারিত তথ্যের বড় অংশ সঠিক। ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রথমবার পাসপোর্ট বইয়ের জন্য সরকারি আবেদন ফি ১৩০ ডলার এবং আবেদন গ্রহণ কেন্দ্রের ফি ৩৫ ডলার। অর্থাৎ মোট খরচ ১৬৫ ডলার। পাসপোর্ট কার্ডের জন্য আবেদন ফি ৩০ ডলার এবং গ্রহণ কেন্দ্রের ফি ৩৫ ডলার। পাসপোর্ট বই ও কার্ড দুটো একসঙ্গে নিলে আবেদন ফি ১৬০ ডলার এবং গ্রহণ কেন্দ্রের ফি ৩৫ ডলার, অর্থাৎ মোট ১৯৫ ডলার।
তবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর পাসপোর্টের খরচ আলাদা। তাদের পাসপোর্ট বইয়ের আবেদন ফি ১০০ ডলার এবং গ্রহণ কেন্দ্রের ফি ৩৫ ডলার। ফলে মোট ১৩৫ ডলার। শিশুর পাসপোর্ট কার্ডের জন্য মোট ৫০ ডলার এবং বই ও কার্ড একসঙ্গে নিলে মোট ১৫০ ডলার নয়, বরং সরকারি হিসাবে ১১৫ ডলার আবেদন ফি এবং ৩৫ ডলার গ্রহণ কেন্দ্রের ফি মিলিয়ে ১৫০ ডলার হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে যোগ্য প্রাপ্তবয়স্কদের পাসপোর্ট নবায়নের জন্য অনলাইন ব্যবস্থা ইতিমধ্যে রয়েছে। কিন্তু প্রথমবার পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে এখনো সশরীরে উপস্থিত হতে হয়। নতুন ঘোষণার মূল পরিবর্তন হচ্ছে এই প্রথমবারের আবেদন প্রক্রিয়াকে অনলাইনে নিয়ে আসা। ফলে নতুন নাগরিক, আগে কখনো পাসপোর্ট না পাওয়া নাগরিক এবং প্রথমবার পাসপোর্টের প্রয়োজন এমন আমেরিকানদের জন্য এটি বড় পরিবর্তন হতে যাচ্ছে।
বাংলা ভাষার বিষয়ে প্রচারিত তথ্যও সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বর্তমানে মার্কিন পাসপোর্টের মূল আবেদনপত্র ও সরকারি আবেদন প্রক্রিয়ার প্রধান উপকরণ বাংলায় পূরণ করার ব্যবস্থা নেই। সরকারি পাসপোর্ট পৃষ্ঠায় ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষার সুবিধা দেখা যায়, কিন্তু প্রথমবার পাসপোর্টের মূল আবেদনপত্র বাংলায় পূরণ করার কোনো সরকারি ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। তাই নতুন ব্যবস্থায় সরাসরি বাংলায় পুরো আবেদন করা যাবে এমন দাবি এখনো করা যাবে না।
বাংলাভাষী আবেদনকারীরা অবশ্য প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত অনুবাদ সহায়তা নিতে পারেন। কিন্তু আবেদনপত্রে নিজের তথ্য ভুলভাবে লেখা উচিত নয়। বিশেষ করে নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, নাগরিকত্বের প্রমাণ, পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে ভুল হলে আবেদন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। বিদেশি ভাষায় তৈরি নাগরিকত্বের প্রমাণপত্রের ক্ষেত্রে পেশাদার ইংরেজি অনুবাদ প্রয়োজন হতে পারে বলেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা। সরকারের কাছে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য সরাসরি ব্যবহারের কারণে পরিচয় যাচাই ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারি আদেশে ব্যক্তিগত তথ্য কম ব্যবহার করা, নিরাপদ পরিচয় যাচাই এবং তথ্য ব্যবহারের অনুমতি নিয়ন্ত্রণের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, নতুন একক অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলেও সশরীরে, ডাকযোগে এবং অন্যান্য বৈধ সরকারি পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে না। অর্থাৎ অনলাইন ব্যবস্থা হবে অতিরিক্ত সহজ পথ, একমাত্র পথ নয়।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থার নির্দিষ্ট চূড়ান্ত উদ্বোধনের তারিখ প্রকাশ করা হয়নি। কিছু সরকারি ও সংবাদসূত্রে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে নতুন সুবিধা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে, আবার রুবিও ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অধিকাংশ আমেরিকানকে সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য জানিয়েছেন। তাই ২০২৭ সালের শুরু থেকেই প্রত্যেক নাগরিক প্রথম পাসপোর্ট অনলাইনে করতে পারবেন এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক হবে না। বাস্তবে ধাপে ধাপে সুবিধাটি চালু হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথমবার পাসপোর্ট আবেদনে এটি একটি বড় ডিজিটাল পরিবর্তনের সূচনা। কাগজপত্র, ছবি তোলা, নির্ধারিত কেন্দ্রে যাওয়া, অর্থ পরিশোধ এবং আবেদন অনুসরণের বর্তমান প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি সহজ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত আবেদনকারীদের বর্তমান নিয়মই অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে প্রথমবার আবেদনকারীদের এখনো নির্ধারিত কেন্দ্রে সশরীরে গিয়ে আবেদন করতে হবে। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে আবেদনকারীদের জন্য ঘরে বসে পাসপোর্ট আবেদনের সুযোগ তৈরি হবে।