ইরানের তেলমন্ত্রী পদত্যাগ, তেল রপ্তানি চাপে তেহরানের অর্থনীতিতে আরও বাড়ছে গভীর সংকট

ইরানের তেলমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, তেল রপ্তানি সংকুচিত হচ্ছে, তবে এটিকে একাই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার নিশ্চিত প্রমাণ বলা এখনই ঠিক নয়।

ইরানের তেলমন্ত্রী পদত্যাগ, তেল রপ্তানি চাপে তেহরানের অর্থনীতিতে আরও বাড়ছে গভীর সংকট

ইরানের তেলমন্ত্রী পদত্যাগ, তেল রপ্তানি চাপে তেহরানের অর্থনীতিতে আরও বাড়ছে গভীর সংকট


ইরানে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে দেশটির তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ পদত্যাগ করেছেন। রোববার তাঁর পদত্যাগের খবর প্রকাশ করে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। পরে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। তাঁর জায়গায় অন্তর্বর্তী তেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় ইরানি তেল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হামিদ বোভার্দকে। 


পাকনেজাদ ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ইরানের তেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর পদত্যাগ এমন সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত, তেল রপ্তানিতে বাধা, নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইরানের জন্য রপ্তানি সংকট সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। 


তবে পদত্যাগের কারণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবির সঙ্গে সরকারি বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা মেহদি তাবাতাবায়ি জানিয়েছেন, পাকনেজাদ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আগে থেকেই পদত্যাগের অনুরোধ করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করার পর হামিদ বোভার্দকে অন্তর্বর্তী তেলমন্ত্রী করা হয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে সরাসরি বলা যায় না যে মার্কিন চাপের কারণেই পাকনেজাদ পদত্যাগ করেছেন। 


তবে পদত্যাগের সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ গত কয়েক সপ্তাহে আরও বেড়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি বলেছেন, চলতি সপ্তাহে ইরানের সমুদ্রে কোনো তেল না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং এর সঙ্গে দেশটির তেল রাজস্বও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি দাবি করেছেন, ইরান তেল উত্তোলন শুরু করার পর এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। 


বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এখন শুধু নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তেল পরিবহন, আর্থিক লেনদেন এবং ইরানের আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির সক্ষমতাকে একসঙ্গে সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে ইরানের কাছে বিদেশি মুদ্রা প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চললে সরকারের আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।


ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাদের নৌ উপস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এই জলপথ দিয়ে তেল পরিবহন আবার বাড়ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ইরান আগের মতো এই পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। 


অন্যদিকে ইরানের অবস্থানও কঠোর। দেশটির সংসদীয় নেতা মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ বলেছেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতায় থাকা শর্তগুলো পূরণ করাই পথ খুলে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। 

এই অবস্থায় ইরানের তেল রপ্তানির প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের নিজস্ব অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সেপ্টেম্বরজুড়ে ইরানের বিভিন্ন তেল স্থাপনা থেকে নতুন তেল বোঝাই কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 


কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের তেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ তাদের তেল পরিবহন বাড়িয়েছে। ফলে পুরো অঞ্চলের তেল প্রবাহ অনেকাংশে আবার আগের মাত্রার কাছাকাছি ফিরেছে। কিছু বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ দিয়ে অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছেছে, যদিও জ্বালানি পণ্য পরিবহনে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে। 


তাই ইরানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নিজের তেল বিক্রি ও পরিবহনের সক্ষমতা। দেশটির তেল রপ্তানি যত কমবে, সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও তত সংকুচিত হবে। এর প্রভাব পড়তে পারে মুদ্রার বিনিময়মূল্য, আমদানি ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। এরই মধ্যে ইরানি মুদ্রা নতুন করে রেকর্ড নিম্নমুখী হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। 


তবে ইরানের সরকার এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে—এমন কোনো সরকারি স্বীকারোক্তি দেয়নি। বরং পাকনেজাদ পদত্যাগের আগে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ইতিমধ্যে বিক্রি করা তেলের অর্থ এখনও দেশে আসছে এবং তা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা করছেন। এই বক্তব্য মার্কিন প্রশাসনের কঠোর দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। 


এখানেই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের তেল আয়ের পথ কার্যত বন্ধ করার দিকে পরিস্থিতি এগোচ্ছে। ইরান বলছে, তাদের বিক্রি করা তেলের অর্থ এখনও আসছে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে তেল পরিবহন ও অর্থপ্রবাহের বাস্তব চিত্রই নির্ধারণ করবে মার্কিন চাপ কতটা কার্যকর হয়েছে।


পাকনেজাদের পদত্যাগ তাই নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন চলমান সংকটের মধ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কিন্তু শুধু এই পদত্যাগের ভিত্তিতে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে বলা এখনই অতিরঞ্জিত হবে।


বরং নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইরানের তেল খাত নজিরবিহীন চাপের মধ্যে রয়েছে। তেল রপ্তানি কমে যাওয়া, হরমুজকে ঘিরে সংঘাত, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক চাপ এবং দুর্বল মুদ্রা—সবকিছু মিলিয়ে তেহরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। নতুন অন্তর্বর্তী তেলমন্ত্রী হামিদ বোভার্দের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থা সচল রাখা এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করা।


অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেলবাহী জাহাজের ওপর চাপ আরও বাড়ায় এবং ইরানের হাতে থাকা শেষ তেলবাহী জাহাজগুলোও বাজারে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তেহরানের রাজস্ব পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে হরমুজ দিয়ে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের তেল পরিবহন পুনরুদ্ধার হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে ইরানের রপ্তানি কমার প্রভাব পুরোপুরি একই মাত্রায় প্রতিফলিত হচ্ছে না। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর