ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড ব্যর্থ, টেনেসির কারা প্রধান ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
ক্রিস্টা পাইকের ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের পর টেনেসির কারা প্রধান পদত্যাগ করেছেন, তদন্ত চলাকালে অঙ্গরাজ্যে বছরের বাকি সব মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।
টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি নজিরবিহীন ব্যর্থতার কয়েক দিনের মধ্যেই অঙ্গরাজ্যের কারা বিভাগের প্রধান ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। গভর্নর বিল লি শনিবার জানান, স্ট্রাডা চলতি অক্টোবরেই দায়িত্ব ছাড়বেন। ৩০ সেপ্টেম্বর ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পরও তিনি মারা না যাওয়ায় এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে অঙ্গরাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি কীভাবে ঘটল, কারা কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করেছিল কি না এবং চিকিৎসাগত জটিলতা কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়েছে।
ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডা ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে টেনেসির কারা বিভাগের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি দাবি করেন, তার বিভাগের কর্মীরা নির্ধারিত কার্যপ্রণালি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে স্বাধীন পর্যালোচনা সামনে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে সরে দাঁড়ানোই টেনেসির মানুষের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে বলে তিনি মনে করেন। গভর্নর বিল লিও স্ট্রাডার দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেছেন এবং কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি অঙ্গরাজ্যের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, স্ট্রাডার পদত্যাগের খবরটি সত্য। এটি কোনো গুজব বা অসমর্থিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি নয়। টেনেসি সরকারের ঘোষণা, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম একই তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত স্ট্রাডার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি নিজেও বলেছেন, নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ফলে পাইকের মৃত্যুদণ্ড ব্যর্থ হওয়ার সরাসরি দায় তার ওপর আইনগতভাবে চূড়ান্ত হয়েছে এমন দাবি এখনই করা যাবে না। স্বাধীন তদন্তের ফলই এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারিত ছিল। তিনি ১৯৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে সহপাঠী কোলিন স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন। হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৯৬ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় তিন দশক ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়ার পর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন নির্ধারিত হয়। তিনি টেনেসিতে আধুনিক যুগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একমাত্র নারী বন্দি ছিলেন এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে অঙ্গরাজ্যে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো।
তবে নির্ধারিত দিনে ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে এগোয়নি। কারা কর্তৃপক্ষ দুটি মাত্রায় পেন্টোবারবিটাল প্রয়োগ করে। এরপর পাইক অচেতন হয়ে পড়লেও তার শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে। পরে তাকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার আইনজীবীরা আদালতে দাখিল করা নথিতে জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে অচেতন অবস্থায় শ্বাসযন্ত্রের সহায়তায় রয়েছেন এবং তার দুই হাতে গুরুতর ফোলা, পোড়া ও ফোসকার মতো আঘাত দেখা গেছে। চিকিৎসকেরা তার শরীরে থাকা ওষুধের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছেন।
পাইকের আইনজীবীদের অভিযোগ, তার শিরায় ওষুধ প্রবেশ করানোর সময় একাধিকবার সূচ ব্যবহার করা হয়েছিল এবং শিরায় সঠিকভাবে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি। তাদের দাবি, পাইকের আগে থেকেই ছোট শিরা এবং রক্তসংক্রান্ত একটি জটিলতা ছিল, যার কারণে শিরায় প্রবেশ করানো কঠিন হতে পারে এমন সতর্কতাও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ এখনো স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। টেনেসির কারা বিভাগ বরং জানিয়েছে, তারা অঙ্গরাজ্যের আইনানুগ ও অনুমোদিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতির প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে।
ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে চলতি বছর টেনেসিতে দ্বিতীয়বারের মতো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি। এর আগে মে মাসে টনি ভন কারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় শিরাপথ স্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে হয়েছিল। সেই ঘটনার পরও কারা বিভাগের কার্যপ্রণালি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেপ্টেম্বরে পাইকের ক্ষেত্রে আবারও প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ায় টেনেসির পুরো মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
পাইকের ঘটনা সামনে আসার পর গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য টেনেসিতে নির্ধারিত সব মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বাধীন পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিরায় ওষুধ প্রবেশের পদ্ধতি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ভূমিকা এবং বিদ্যমান নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের মতে, ঘটনাটি শুধু একজন কর্মকর্তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার মতো বিষয় নয়। তাদের প্রশ্ন, যদি কার্যপ্রণালিতে কোনো কাঠামোগত সমস্যা থাকে, তাহলে একজন কমিশনারের পরিবর্তন সমস্যার পূর্ণ সমাধান করবে কি না। পাইকের আইনজীবীরাও বলেছেন, ঘটনাটি একজন ব্যক্তির ব্যর্থতার চেয়ে বড় এবং পুরো মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে। অন্যদিকে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বাধীন তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ক্রিস্টা পাইকের শারীরিক অবস্থা এবং তদন্তের ফলাফল। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসকেরা জীবন রক্ষার চেষ্টা করছেন। এ ঘটনায় টেনেসির মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার ওপর নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্ট্রাডার পদত্যাগ সেই বিতর্কের প্রথম বড় প্রশাসনিক পরিণতি হলেও, প্রকৃত দায় ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করবে স্বাধীন তদন্তের ফল।





