ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ৫ হাজারের বেশি আটক, ১২০০ বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন
শিক্ষক সংকট, বড় শ্রেণিকক্ষ ও অপর্যাপ্ত বাজেটের বিরুদ্ধে ফ্রান্সজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভে পাঁচ হাজারের বেশি আটক, শতাধিক শিক্ষার্থী ও কর্মী আহত
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ৫ হাজারের বেশি আটক, ১২০০ বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন
ফ্রান্সে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, জরাজীর্ণ ভবন এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ না দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দ্রুত জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। প্যারিসের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র উপশহর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার পর্যন্ত দেশের প্রায় ৭৩৫টি বিদ্যালয় কোনো না কোনোভাবে বিক্ষোভ, অবরোধ বা আন্দোলনের কারণে প্রভাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগের দিন এক হাজারের বেশি বিদ্যালয় আন্দোলনের আওতায় এসেছিল। সামগ্রিকভাবে সপ্তাহজুড়ে ১২০০টির বেশি উচ্চবিদ্যালয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
আন্দোলনের শুরুটা ছিল মূলত শিক্ষাব্যবস্থার দৈনন্দিন সমস্যাকে ঘিরে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম। কোনো শিক্ষক অসুস্থ বা অনুপস্থিত হলে দ্রুত বিকল্প শিক্ষক পাওয়া যায় না। ফলে দিনের পর দিন ক্লাস বাতিল হচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষার্থী গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার আগে প্রয়োজনীয় বিষয় পড়ার সুযোগও পাচ্ছে না। প্যারিসের উপশহরের এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, গত শিক্ষাবর্ষে তিনি ফরাসি ভাষার পরীক্ষায় অংশ নিলেও কয়েক মাস নিয়মিত শিক্ষক পাননি। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরীক্ষায় ভালো ফল করা অত্যন্ত কঠিন।
শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় অভিযোগ শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত ভিড়। কোনো কোনো শ্রেণিতে ৩৫ থেকে ৪০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকছে। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত চেয়ারও নেই। দুপুরের বিরতিতে খাবার নেওয়ার জন্যও পর্যাপ্ত সময় বা ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকতে হলেও শিক্ষার পরিবেশ অনুকূল নয় বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করছে। সাম্প্রতিক গরমের সময় কিছু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তিও হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কোথাও ছাদ থেকে পানি পড়ছে, কোথাও ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। প্যারিসের দরিদ্র উপশহর সেইন-সাঁ-দেনি এলাকায় সমস্যাটি আরও প্রকট বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করছে। সেখানে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এলাকার বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও সামাজিক চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থ পাচ্ছে না।
বিক্ষোভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে আগামী বছরের শিক্ষা বাজেট। ফরাসি সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা খাতে ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ইউরো করার কথা রয়েছে। তবে সমালোচকদের দাবি, মূল্যস্ফীতির তুলনায় এই বৃদ্ধি কম। সরকার অবশ্য বলছে, শিক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিও বাজেট পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হয়েছে। একই সময়ে ২০২৬ সালে দেশজুড়ে ৩ হাজার ২৫৬টি শিক্ষক পদ কমানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠন।
বিক্ষোভ যত ছড়িয়েছে, ততই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করেছে। কোথাও আবর্জনার স্তূপে আগুন দেওয়া হয়েছে, কোথাও পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছোড়া হয়েছে। প্যারিসে দুটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথে আগুনে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। মার্সেই, স্ট্রাসবুর্গ, লিয়ঁ, লিল, তুর, রেঁন এবং আরও কয়েকটি শহরেও পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার গুলি ছুড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশকে লক্ষ্য করে আগুন জ্বালানো, আতশবাজি বা অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। এ নিয়ে উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তুলেছে। কিছু শিক্ষার্থী দাবি করেছে, পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কিছু বিক্ষোভকারী ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা করেছে।
আটকের সংখ্যা নিয়েও পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, শুক্রবার এক দিনেই ১ হাজার ৭৪৭ জনকে আটক করা হয়েছে। এর ফলে সোমবার থেকে সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত মোট আটক পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। প্যারিসের পুলিশ প্রধান পাত্রিস ফোর জানিয়েছেন, আটক হওয়া মানুষের বড় অংশই কিশোর। তিনি আন্দোলনের বর্তমান পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো বলে বর্ণনা করেছেন এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্দোলনে আহতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর অন্তত ৬৫ জন শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন বিদ্যালয়ের প্রধান। একই সময়ে প্রায় ১৭০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। শতাধিক বিদ্যালয় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি রয়েছে। কোথাও কোথাও দাবি করা হয়েছে, পেট্রল ঢেলে স্থানীয় একজন প্রধান শিক্ষককে গুরুতর আহত করা হয়েছে। যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, পেট্রল ছিটানোর একটি ঘটনা সত্য হলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেটি একইভাবে বর্ণিত হয়নি। মার্সেইয়ের একটি বিদ্যালয়ের কাছে এক শিক্ষার্থী আবর্জনার পাত্রে পেট্রল ছোড়ার চেষ্টা করলে কয়েকজন শিক্ষক অনিচ্ছাকৃতভাবে পেট্রলে ভিজে যান। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করেছে। তাই নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এটিকে একজন প্রধান শিক্ষককে ইচ্ছাকৃতভাবে পেট্রল ঢেলে আহত করার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
সহিংসতার কারণে সরকার আন্দোলনের মূল দাবিগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও মোকাবিলা করছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নো জরুরি বৈঠক ডেকে মন্ত্রীদের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বা অবরুদ্ধ বিদ্যালয়ের অনেকগুলোতে সাময়িকভাবে দূরশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সের সরকার আন্দোলনের বৈধ দাবিগুলো স্বীকার করলেও সহিংসতার জন্য উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করছে। সরকারের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বামপন্থী রাজনৈতিক দল ফ্রান্স আনবোশের আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর অভিযোগ করেছেন। দলটির নেতারা অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সরকার প্রকৃত সমস্যার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করার চেষ্টা করছে। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমগুলোও বলছে, আন্দোলনে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও রাজনৈতিক মতের মানুষ যুক্ত হয়েছে। তাই পুরো আন্দোলনকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রিত আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন।
আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সহিংসতার আড়ালেও শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো ব্যাপকভাবে উঠে আসছে। তারা বলছে, তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকবে, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত ভিড় থাকবে না, বিদ্যালয় ভবন নিরাপদ থাকবে এবং অনুপস্থিত শিক্ষক দ্রুত বদলি করা হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য অন্য এলাকার শিক্ষার্থীদের মতো সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হয়েছে।
ফরাসি সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে দুটি বিষয় সামলানো। একদিকে বিদ্যালয়ের বাস্তব সমস্যা ও শিক্ষার্থীদের বৈধ দাবির সমাধান করা, অন্যদিকে বিক্ষোভের নামে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ বন্ধ করা। সরকার যদি শুধু আইনশৃঙ্খলা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তাহলে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে। আবার সহিংসতার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আগামী দিনগুলোতে আলোচনা, শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয় সংস্কার এবং বাজেট সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে এই আন্দোলন কোন দিকে যায়।