চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘গ্রেট গেম’ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আর শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি, সমুদ্রপথ, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক প্রভাব— দুই পরাশক্তির মধ্যে তৈরি হচ্ছে নতুন এক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা।
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘গ্রেট গেম’ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাণিজ্য ও অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা, সমুদ্রপথ, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করতে অনেক সময় ‘নতুন গ্রেট গেম’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের নাম নয়; বরং দুই পরাশক্তির দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বোঝাতে ব্যবহৃত একটি বিশ্লেষণধর্মী উপমা।
ঐতিহাসিকভাবে ‘গ্রেট গেম’ বলতে উনিশ শতকে ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্য এশিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে বোঝানো হতো। বর্তমান চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি সেই সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই বড় শক্তিগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বর্তমান প্রতিযোগিতায় সরাসরি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, কূটনীতি ও সামরিক জোট বড় ভূমিকা রাখছে।
চীন গত কয়েক দশকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশটির বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান বেইজিংকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো, বন্দর, রেলপথ, সড়ক ও জ্বালানি প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ দেশটির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রধান শক্তি। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, উন্নত প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় বিস্তৃত সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব ওয়াশিংটনের প্রভাব ধরে রাখার অন্যতম ভিত্তি। ফলে চীন যেমন অর্থনৈতিক ও শিল্প সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রও প্রযুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থা ও মিত্রজোটের মাধ্যমে নিজের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
প্রযুক্তি খাত এই প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর বা উন্নত চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ—এসব ক্ষেত্রে কে কতটা এগিয়ে থাকবে, তা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সমুদ্রপথ ও বন্দর নিয়েও দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হওয়ায় বন্দর, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক যোগাযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বন্দর ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এ ক্ষেত্রে দেশটির প্রভাব বাড়িয়েছে।
তাইওয়ান ইস্যুও চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে চীন, অন্যদিকে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। এই বিষয়টি দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগর, উন্নত প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সামরিক সক্ষমতা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
তবে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কেবল সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা কমাতে আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে যোগাযোগ ও আলোচনাও অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রতিযোগিতার প্রভাব শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ভারত, জাপান, ইউরোপীয় দেশগুলো, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রও নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করছে। অনেক দেশ একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখছে।
ফলে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা ক্রমেই একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুস্তরীয় রূপ নিচ্ছে। এর প্রভাব বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, সামরিক নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর পড়ছে। আর এই কারণেই দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে অনেক বিশ্লেষণে ‘নতুন গ্রেট গেম’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।