ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নয়, দাম কমাতে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ছে জি৭

জ্বালানি দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের চাপে জি৭ মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ট্রাম্পও রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাদ দিয়েছেন।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নয়, দাম কমাতে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ছে জি৭

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নয়, দাম কমাতে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ছে জি৭


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না। এই ঘোষণা এসেছে জি৭ দেশগুলোর জরুরি বৈঠকের পর, যেখানে জ্বালানির বাজারে বাড়তে থাকা চাপ সামাল দিতে আগামী চার মাসে সমন্বিতভাবে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও জ্বালানি মজুত থেকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জি৭-এর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন। 

ফ্যাক্ট যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, মূল খবরটি সত্য। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। জি৭-এর সরকারি বিবৃতিতে ১০ কোটি ব্যারেলকে শুধু ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল হিসেবে আলাদা করে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে মোট ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি মজুত থেকে ছাড়ার কার্যক্রম শুরু হবে। এর মধ্যে প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে আনার কথা বলা হয়েছে। তাই ১০ কোটি ব্যারেল পুরোপুরি ডিজেল—এমন দাবি সঠিক নয়। 

২ অক্টোবর জি৭ নেতারা জ্বালানির বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাজ্যের নেতারা অংশ নেন। বৈঠকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সভাপতিত্ব করেন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাকে মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার কার্যক্রম সমন্বয় ও এর প্রভাব পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

জি৭-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু হবে এবং প্রায় চার মাস চলবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ডিজেলকে। প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে আরও ডিজেল ছাড়ার বিষয়েও আলোচনা করবে জি৭ দেশগুলো। 

এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, তেল সরবরাহের পথ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন স্থানে পরিশোধনাগার ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বাজারে চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব বিশেষভাবে ডিজেলের দামে দেখা গেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মূল্য সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ কারণে কৃষক, পরিবহন ব্যবসা, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এবং পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছে। ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ি বা ট্রাক চালানোর খরচই বাড়ে না, পণ্য পরিবহন ও কৃষি উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বিভিন্ন পণ্যের দামের ওপর পড়তে পারে। 

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করার দাবি জোরালো হয়েছিল। যুক্তি ছিল, বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে বেশি ডিজেল রাখা গেলে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং দামের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে জ্বালানি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ আশঙ্কা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করলে ইউরোপসহ অন্য বাজারে সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে। 

ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার জন্য চাপ দিয়েছিল। আলোচনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের সম্ভাবনাও সামনে আসে। তবে ২ অক্টোবর জি৭-এর সমঝোতার পর ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, যুক্তরাষ্ট্র আর ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেবে না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাঁর এই বক্তব্য নিশ্চিত করা হয়েছে। 

ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে জি৭-এর যৌথ ঘোষণারও মিল রয়েছে। জি৭ নেতারা বলেছেন, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি ও জ্বালানি পণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ না করার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে তারা অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশগুলোকেও এমন নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যা বাজারের অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে। 

অর্থাৎ বর্তমান সিদ্ধান্তের কাঠামো হলো একদিকে জরুরি মজুত থেকে জ্বালানি বাজারে আনা, অন্যদিকে জ্বালানি চলাচলে নতুন বাধা সৃষ্টি না করা। এর ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

জি৭-এর সরকারি বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলো নিজেদের পরিশোধনাগারের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের সময়সূচি সমন্বয় করবে। এর উদ্দেশ্য হলো একই সময়ে অনেক পরিশোধনাগার বন্ধ হয়ে গিয়ে বাজারে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো। যেসব দেশে বড় পরিশোধন সক্ষমতা রয়েছে, তাদেরও বিশেষ করে ডিজেল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করা হবে। 

তবে মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। জরুরি মজুত মূলত সংকটের সময় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ দেওয়ার জন্য রাখা হয়। তাই মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে ছাড়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের চাপ কমতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকট থাকলে পরে মজুত পুনরায় পূরণ করার প্রয়োজন হবে। জি৭ নিজস্ব বিবৃতিতেও ভবিষ্যতে মজুত পুনরায় পূরণ এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে সুপারিশ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। 

এর আগে মার্চ মাসেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে বড় আকারে জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়া হয়েছিল। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেই কার্যক্রমে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল কৌশলগত মজুত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং এর বড় অংশ ইতোমধ্যে বাজারে এসেছে। নতুন ১০ কোটি ব্যারেল ছাড়ার পরিকল্পনা সেই ধারাবাহিকতারই পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বাজারে ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জি৭-এর মজুত ছাড়ার খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ডিজেল বাজারে দামে পতন দেখা যায়। তবে বাজারের এই প্রতিক্রিয়া স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রকৃতপক্ষে কত দ্রুত এবং কত পরিমাণ জ্বালানি বাজারে আসে তার ওপর। 

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জি৭-এর ঘোষণায় প্রতিটি দেশ কত ব্যারেল করে ছাড়বে, তার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ১০ কোটি ব্যারেলের পুরো পরিমাণ কোন দেশ থেকে কত আসবে, তার চূড়ান্ত চিত্র এখনো পরিষ্কার নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আগামী দিনগুলোতে এর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর