কর্নেল ধর্ষণ তদন্তে লেটিশিয়া জেমসকে নিয়োগ, হোচুলের সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের তীব্র আপত্তি
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন তদন্তে লেটিশিয়া জেমসকে বিশেষ কৌঁসুলি করলেন হোচুল, সিদ্ধান্তের ন্যায়সংগততা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ট্রাম্প।
কর্নেল ধর্ষণ তদন্তে লেটিশিয়া জেমসকে নিয়োগ, হোচুলের সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের তীব্র আপত্তি
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের অক্টোবরে। নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র সংগঠনের বাসভবনে এক নারী শিক্ষার্থীকে একাধিক ব্যক্তি যৌন নিপীড়ন করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। আদালতের নথিতে ওই নারীকে পরিচয় গোপন রেখে ‘জেন ডো’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, ঘটনার আগে তিনি মদ্যপান করেছিলেন এবং পরে তাকে মাদকও দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি অচেতন বা অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় যৌন নিপীড়নের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
ঘটনাটি প্রথমে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও টম্পকিনস কাউন্টির জেলা কৌঁসুলির কার্যালয়ে যায়। ২০২৪ সালে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। তৎকালীন জেলা কৌঁসুলি ম্যাথিউ ভ্যান হাউটেনের বক্তব্য ছিল, পুলিশের কাছে দেওয়া শপথবদ্ধ বিবৃতিতে যৌন সম্পর্কের বিষয়টি স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে ও সম্মতিপূর্ণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছিল এবং সেই সময়কার তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত তথ্য পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা পুলিশের সাক্ষাৎকারের নথিতে দেখা যায়, ওই নারী তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে তিনি মনে করেন তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু পরে জেলা কৌঁসুলির কাছে পাঠানো সংক্ষিপ্ত শপথবদ্ধ বিবৃতিতে সেই বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
এই তথ্য প্রকাশের পর প্রশ্ন ওঠে, তদন্তকারীরা ওই নারীর পূর্ণ বক্তব্য কেন যথাযথভাবে নথিবদ্ধ ও উপস্থাপন করেননি। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুলও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের ভূমিকা এবং স্থানীয় কৌঁসুলির কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নতুন তথ্য গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা কৌঁসুলির কার্যালয় ওই নারী বা অভিযোগের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের সরাসরি সাক্ষাৎকারও নেয়নি।
এই পরিস্থিতিতে ১ অক্টোবর হোচুল একটি নির্বাহী আদেশে নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের কার্যালয়কে বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ দেন। এর ফলে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব স্থানীয় জেলা কৌঁসুলির পরিবর্তে জেমসের কার্যালয়ের অধীনে চলে যায়। জেমসের কার্যালয় জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি পূর্ণাঙ্গ ও ন্যায্যভাবে তদন্ত করবে এবং প্রয়োজন হলে অভিযোগ ও প্রমাণ পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবে।
হোচুলের এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, নতুন তথ্যের কারণে টম্পকিনস কাউন্টির জেলা কৌঁসুলির কার্যালয় এই মুহূর্তে মামলাটি কার্যকরভাবে তদন্ত ও পরিচালনা করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে তাঁর আস্থা কমেছে। তিনি আরও বলেন, নতুন বিশেষ কৌঁসুলির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি নতুন করে এবং স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ট্রাম্প এই নিয়োগের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন হোচুল লেটিশিয়া জেমসকে এই মামলায় দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি জেমসকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত কৌঁসুলি’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁকে নিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আইনি বিরোধের প্রসঙ্গ সামনে আনেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্যের এই অংশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যে বলা হচ্ছে, জেমস নাকি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় সফলভাবে বিচার পরিচালনা করেছিলেন। বিষয়টি সঠিকভাবে বলা হচ্ছে না। জেমস নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি প্রতারণা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে ফৌজদারি মামলায় ৩৪টি ব্যবসায়িক নথি জালিয়াতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, সেটি ম্যানহাটনের জেলা কৌঁসুলির কার্যালয়ের মামলা ছিল, জেমসের কার্যালয়ের নয়। তাই দুই মামলাকে এক করে দেখা তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
জেমসের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের অভিযোগও নতুন নয়। একইভাবে জেমস ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলায় নিজের ভূমিকা আইন ও তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে বলে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে কর্নেল মামলায় তাঁর নিয়োগকে ঘিরে ট্রাম্পের আপত্তির পেছনে তাঁদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাতের প্রেক্ষাপট রয়েছে। তবে এই সংঘাতের কারণে জেমস কর্নেল মামলায় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারবেন না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিউইয়র্কের যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত আইন। স্থানীয় জেলা কৌঁসুলি বলেছেন, ভুক্তভোগী স্বেচ্ছায় মদ বা মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, এবং সেই অবস্থায় তিনি সম্মতি দেওয়ার মতো সক্ষম ছিলেন কি না, তা আইনি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ বিষয়টি নিয়ে নিউইয়র্কের আইন পরিবর্তনের দাবিও নতুন করে জোরালো হয়েছে। গভর্নর হোচুল বলেছেন, কেউ নিজে মদ বা মাদক গ্রহণ করলেও যদি সে এতটাই অচেতন বা অসহায় হয়ে পড়ে যে সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা থাকে না, তাহলে সেটিকে যৌন নিপীড়নের আইনে আরও স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা উচিত।
এরই মধ্যে টম্পকিনস কাউন্টির জেলা কৌঁসুলির কার্যালয় মামলাটি আবারও তদন্তে নেয়। তবে জেমসকে বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগের পর তদন্তের নেতৃত্ব এখন তাঁর কার্যালয়ের হাতে। জেলা কৌঁসুলি ভ্যান হাউটেন বলেছেন, তিনি জেমসের নিয়োগকে সমর্থন করছেন এবং তদন্তে সহযোগিতা করবেন। তিনি আরও বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের পুরো চিত্র তাঁর কার্যালয়ের কাছে আগে ছিল না।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ও জেমসের নিয়োগের বিরোধিতা করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, তারা স্বাধীন বহিরাগত পর্যালোচনায় সহযোগিতা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তদন্তেও ওই ছাত্র সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনও অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এদিকে অভিযোগকারী নারীর আইনজীবীও জেমসকে বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় তদন্তের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার কারণে নতুন নেতৃত্বে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখনো একটি চলমান ফৌজদারি তদন্ত। অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নথি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং পুলিশের সাক্ষাৎকারের তথ্য সবকিছু নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমন কোনো চূড়ান্ত রায় এখনো নেই। একইভাবে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল হবে কি না, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘লেটিশিয়া জেমস দুর্নীতিগ্রস্ত’, ‘তিনি ন্যায়বিচার করবেন না’ কিংবা ‘তাঁকে এই মামলার কাছেও থাকা উচিত নয়’ এ ধরনের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। এগুলো মূলত ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত। যাচাই করা তথ্য হলো, হোচুল নির্বাহী আদেশে জেমসকে বিশেষ কৌঁসুলি করেছেন, স্থানীয় তদন্ত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে, মামলাটি পুনরায় সক্রিয় হয়েছে এবং জেমসের কার্যালয় এখন অভিযোগ ও প্রমাণ স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করছে।
এই তদন্তের পরবর্তী ধাপে নতুন সাক্ষ্য, পুলিশের নথি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পরীক্ষা করা হবে। প্রমাণ যথেষ্ট হলে বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে যেতে পারে, আবার আইনগত মানদণ্ড পূরণ না হলে ভিন্ন সিদ্ধান্তও হতে পারে। ফলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কে রাজনৈতিকভাবে কী বলছেন তা নয়, বরং তদন্তে কী প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই প্রমাণের ভিত্তিতে নিউইয়র্কের আইন অনুযায়ী কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।