কলকাতায় ব্রাজিলের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ভারত ম্যাচে আনন্দময় ফুটবলের প্রতিশ্রুতি দিলেন কোচ আনচেলত্তি
কলকাতায় ব্রাজিলের জমকালো আগমন, ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ম্যাচে আনন্দময় ফুটবল উপহার দিতে চান কোচ কার্লো আনচেলত্তি, সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে মুখর শহর।
কলকাতায় ব্রাজিলের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ভারত ম্যাচে আনন্দময় ফুটবলের প্রতিশ্রুতি দিলেন কোচ আনচেলত্তি
কলকাতায় পৌঁছে ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। শনিবার ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক প্রীতি ম্যাচকে সামনে রেখে পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী দলটি এখন কলকাতায় অবস্থান করছে। দলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানিয়েছেন, শুধু ফলের দিকে তাকিয়ে নয়, সমর্থকদের আনন্দ দেওয়ার মতো উপভোগ্য ফুটবল খেলাই হবে তাদের অন্যতম লক্ষ্য। শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের উষ্ণতা ও ব্রাজিলের প্রতি দীর্ঘদিনের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে এই ম্যাচকে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ভারত ও ব্রাজিলের এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে কলকাতার বিখ্যাত যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে, যা সল্ট লেক স্টেডিয়াম নামেও পরিচিত। ম্যাচটি শনিবার, ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময় রয়েছে। ভারতীয় ফুটবল ইতিহাসে ম্যাচটির গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ সিনিয়র পুরুষ জাতীয় পর্যায়ে এটাই ভারত ও ব্রাজিলের প্রথম মুখোমুখি লড়াই। ভারতের বিপক্ষে এর আগে ব্রাজিলের সিনিয়র জাতীয় দল এমন ম্যাচ খেলেনি।
ব্রাজিলের কলকাতা আগমন ঘিরে শুরু থেকেই ছিল ব্যাপক আগ্রহ। বৃহস্পতিবার রাতে দলটি কলকাতায় পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে বিমানবন্দর ও দলটির যাতায়াতের পথে সাধারণ দর্শকদের উপস্থিতি সীমিত রাখা হয়েছিল। তারপরও বিমানবন্দর ও হোটেলের আশপাশে ব্রাজিলের সমর্থকদের উপস্থিতি দেখা যায়। দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ঘিরে ছিল বিশেষ আগ্রহ। হোটেলে প্রবেশের সময় তাকে দেখে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
তবে কলকাতায় ব্রাজিলকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের চিত্র নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, দলটি উৎসবমুখর অভ্যর্থনা পেয়েছে এবং কলকাতার ফুটবলপ্রেমীরা ব্রাজিলের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর নিরাপত্তা, দুর্গাপূজার প্রস্তুতি এবং তুলনামূলক বেশি টিকিটের দামের কারণে শহরের সর্বত্র প্রত্যাশিত মাত্রার উন্মাদনা দেখা যায়নি। অর্থাৎ ব্রাজিলের প্রতি কলকাতার ঐতিহাসিক আবেগ নিয়ে কোনো সন্দেহ না থাকলেও এবারের ম্যাচ ঘিরে মাঠের বাইরের পরিবেশ সর্বত্র একই রকম ছিল না।
কলকাতার সঙ্গে ব্রাজিলের ফুটবলের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বিশ্বকাপের সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় ব্রাজিলের পতাকা ও হলুদ-সবুজ রঙের সাজসজ্জা দেখা যায়। একইভাবে আর্জেন্টিনারও রয়েছে বড় সমর্থকগোষ্ঠী। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের প্রতি কলকাতার মানুষের এই আবেগ কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা কলকাতায় খেলতে এসে বিপুল দর্শক টেনেছিল। সল্ট লেক স্টেডিয়ামে সেই ম্যাচে ষাট হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রাজিলও ২০১৭ সালে ভারতের মাটিতে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল।
এবারের ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে মাঠে নামার জন্য রয়েছে একাধিক পরিচিত তারকা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্দ্রিক, এস্তেভাও, রায়ান, স্যামুয়েল লিনো এবং পেদ্রোর মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড় রয়েছেন দলে। রক্ষণভাগে অধিনায়ক মারকিনিয়োস, গ্যাব্রিয়েল মাগালিয়ায়েসসহ অভিজ্ঞ খেলোয়াড় রয়েছেন। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারায়েস, দগলাস লুইজসহ একাধিক পরিচিত নাম রয়েছে।
তবে ব্রাজিলের মূল দলে শুরুতে থাকা রাফিনিয়া এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আগের ম্যাচে উরুর চোট পাওয়ার পর তিনি দল থেকে ছিটকে গেছেন এবং দেশে ফিরে গেছেন। ব্রাজিল তার জায়গায় নতুন কাউকে দলে নেয়নি। এর ফলে আক্রমণভাগে অন্য খেলোয়াড়দের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ব্রাজিল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে। প্রথম ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। পরের ম্যাচে ব্রাজিল ৪-২ গোলে জয় পায়। দ্বিতীয় ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গোল করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই দুটি ম্যাচের পরই ব্রাজিল কলকাতায় এসেছে। ফলে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি দলটির জন্য নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া এবং বিভিন্ন কৌশল পরখ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কার্লো আনচেলত্তি ম্যাচটির আগে ভারতীয় দলকে যথেষ্ট সম্মান দেখানোর কথা বলেছেন। তিনি ভারতীয় দলের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় রায়ান উইলিয়ামসের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ব্রাজিলের অধিনায়ক মারকিনিয়োস আবার ভারতীয় গোলরক্ষক গুরপ্রীত সিং সান্ধুর প্রশংসা করেছেন। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ব্রাজিল ম্যাচটিকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছে না।
আনচেলত্তির বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আনন্দ নিয়ে ফুটবল খেলা। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ফুটবলশৈলীর সঙ্গে সৃজনশীলতা, দ্রুত আক্রমণ, ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে। আনচেলত্তি মনে করেন, ফুটবলে আনন্দ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার দর্শকদের সামনে সেই আনন্দময় ফুটবলের প্রকাশ ঘটাতে চান তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিটি ম্যাচ থেকেই দল কিছু শেখার সুযোগ পায়।
ব্রাজিলের অধিনায়ক মারকিনিয়োসও কলকাতায় আসার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতে এসে খেলা শুধু একটি ম্যাচে অংশ নেওয়া নয়, দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলকে সমর্থন করে আসা ভারতীয় সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও একটি সুযোগ। ব্রাজিলের বাইরে ভারতের সমর্থকগোষ্ঠী বড় এমন মন্তব্যও তিনি করেছেন।
ভারতের জন্য ম্যাচটি আরও ভিন্ন অর্থ বহন করছে। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সরাসরি মাঠে নামার সুযোগ পাচ্ছে ভারতীয় দল। বর্তমান বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজিল পঞ্চম এবং ভারত ১৩৮তম অবস্থানে রয়েছে। ফলে র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান অনেক বড়। রয়টার্সের হিসাবে, ১৯৯৮ সালের পর ভারতের মতো এত নিচের র্যাঙ্কিংয়ের দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের এটি সবচেয়ে নিচের অবস্থানে থাকা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচ হতে যাচ্ছে।
তবে ফুটবলে র্যাঙ্কিং মাঠের ফল নিশ্চিত করে না। ভারতের জন্য এই ম্যাচের বড় গুরুত্ব হলো বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য যাচাই করা। ভারতীয় দলের কোচ খালিদ জামিলও ম্যাচটির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন। সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিলের কোচ আনচেলত্তি ও খালিদ জামিলকে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাতেও দেখা গেছে।
ব্রাজিলের জন্যও ম্যাচটি নতুন একটি পর্বের অংশ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের পর দলটি নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে ভবিষ্যৎ দল গঠনের দিকে নজর দিচ্ছে। আনচেলত্তি তরুণদের সুযোগ দিয়ে দলটির ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ শক্তি যাচাই করছেন। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে নতুন খেলোয়াড়দের মাঠে নামানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। গোলরক্ষক পেদ্রো মরিসকোকে আগের দুই ম্যাচে না খেলিয়ে এবার শুরু থেকে খেলানোর পরিকল্পনার কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
ভারতীয় দর্শকদের জন্য ম্যাচটি তাই একসঙ্গে কয়েকটি কারণে বিশেষ। একদিকে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের সিনিয়র জাতীয় দল ভারতের মাটিতে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলছে, অন্যদিকে মাঠে দেখা যেতে পারে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্দ্রিক, মারকিনিয়োস ও ব্রুনো গিমারায়েসের মতো তারকাদের। অন্যদিকে ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে ভারতীয় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে কলকাতায় শনিবারের রাতটি ভারতীয় ফুটবলের জন্য স্মরণীয় হওয়ার অপেক্ষায়। এক পাশে পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল, অন্য পাশে নিজেদের ঘরের মাঠে ইতিহাস গড়ার সুযোগ পাওয়া ভারত। আনচেলত্তি যেখানে দর্শকদের আনন্দ দিতে চান, ভারত চাইবে নিজেদের সামর্থ্য দেখাতে। মাঠে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তার উত্তর মিলবে খেলা শুরু হওয়ার পর। তবে ম্যাচের আগেই একটি বিষয় নিশ্চিত ব্রাজিলের কলকাতা সফর ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিরল এক আন্তর্জাতিক ফুটবল অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।