এআইয়ের নতুন ফাঁদে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ, সাইবার প্রতারণায় এক বছরে ক্ষতি প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার

যুক্তরাষ্ট্রে এআই ও ক্রিপ্টো প্রতারণার ভয়াবহ বিস্তার, এক বছরে অনলাইন জালিয়াতিতে নাগরিকদের প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে এফবিআই।

এআইয়ের নতুন ফাঁদে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ, সাইবার প্রতারণায় এক বছরে ক্ষতি প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার

এআইয়ের নতুন ফাঁদে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ, সাইবার প্রতারণায় এক বছরে ক্ষতি প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার


যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণা ও সাইবার অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধের কারণে দেশটির নাগরিকদের প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে এ ধরনের অপরাধের অভিযোগ জমা পড়েছে ১০ লাখেরও বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা এফবিআইয়ের ইন্টারনেট অপরাধ অভিযোগ কেন্দ্রের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ১০ লাখ ৮ হাজার ৫৯৭টি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অভিযোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এফবিআই জানিয়েছে, প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়, জাল বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহায়তার নামে প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মতো বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। এর মধ্যে বিনিয়োগভিত্তিক প্রতারণা সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির কারণগুলোর একটি।

প্রায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার অভিযোগ ছিল সাইবারভিত্তিক প্রতারণা সংক্রান্ত। এসব অভিযোগে মোট ক্ষতির পরিমাণ ১৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রতারণাজনিত মোট ক্ষতির প্রায় ৪৯ শতাংশের সঙ্গে বিনিয়োগ প্রতারণার সম্পর্ক রয়েছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি

২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি-সম্পর্কিত প্রতারণায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এ ধরনের অভিযোগ জমা পড়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৫৬৫টি।

এফবিআই বলছে, প্রতারকেরা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, খুদে বার্তা, পরিচিতির সূত্র, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন কিংবা অনলাইন বিনিয়োগের প্রস্তাবের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রথমে তারা বিশ্বাস তৈরি করে। এরপর ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করে।

কখনো শুরুতে সামান্য অর্থ ফেরত দিয়ে বিনিয়োগকারীকে বিশ্বাস করানো হয় যে প্ল্যাটফর্মটি সত্যিকারের। পরে বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়ার পর টাকা উত্তোলনের সময় কর, ফি বা অন্য কোনো অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী নিজের জমা দেওয়া অর্থও ফেরত পান না।

এআই দিয়ে প্রতারণার নতুন কৌশল

২০২৫ সালের প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতারণা নিয়ে আলাদা তথ্য প্রকাশ। এফবিআই জানিয়েছে, প্রথমবারের মতো তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এআই-সম্পর্কিত প্রতারণার জন্য পৃথক অংশ রাখা হয়েছে।

২০২৫ সালে এআই-সম্পর্কিত ২২ হাজার ৩৬৪টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগে সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৯৩ মিলিয়ন ডলার।

প্রতারকেরা এআই ব্যবহার করে ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়, বিশ্বাসযোগ্য বার্তা, নকল পরিচয়পত্র, কণ্ঠস্বরের অনুকরণ এবং বাস্তব মানুষের মতো দেখতে ভিডিও তৈরি করছে। ফলে আগে যে ধরনের প্রতারণা সহজে শনাক্ত করা যেত, সেগুলো এখন অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।

এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কণ্ঠস্বর নকল করে পরিবারের সদস্য বা পরিচিত ব্যক্তির মতো কথা বলেও প্রতারণা করা হচ্ছে। আবার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার মতো করে তৈরি করা বার্তার মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

৬০ বছরের বেশি বয়সীদের বড় ক্ষতি

প্রতারণার ক্ষেত্রে বয়স্ক নাগরিকরাও বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালে ৬০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকেরা প্রায় ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে এফবিআই। বয়স্ক ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বিনিয়োগ প্রতারণা, প্রযুক্তিগত সহায়তার নামে প্রতারণা এবং পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের মতো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রতারকদের বিরুদ্ধে এফবিআইয়ের উদ্যোগ

সাইবার প্রতারণার ক্ষতি কমাতে এফবিআই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করে সতর্ক করার জন্য ‘অপারেশন লেভেল আপ’ চালু করা হয়েছে।

এফবিআই জানিয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৮ হাজারের বেশি ভুক্তভোগীকে সতর্ক করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি ঠেকাতে সহায়তা করা হয়েছে।

এফবিআই নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছে, অনলাইনে অপরিচিত কেউ দ্রুত অর্থ পাঠাতে চাপ দিলে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত হওয়া কারও পরামর্শে বিনিয়োগ না করা এবং অস্বাভাবিক বেশি লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব যাচাই না করে গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

কেউ প্রতারণার শিকার হলে প্রমাণ হিসেবে বার্তা, ফোন নম্বর, ই-মেইল, ওয়েবসাইটের তথ্য, অর্থ লেনদেনের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে এফবিআই।

প্রতিবেদনটি মূলত এফবিআইয়ের কাছে জমা পড়া অভিযোগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ সব ভুক্তভোগী প্রতারণার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানান না।

এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার যত বাড়ছে, প্রতারকেরাও এসব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন কৌশল তৈরি করছে। ফলে অনলাইন লেনদেন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং তথ্য যাচাই এখন আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর