ভারতের কারখানায় নতুন বিনিয়োগ কমলেও কর্মসংস্থানে রেকর্ড, বাড়ল শিল্পের উৎপাদন
নতুন বিনিয়োগে ধাক্কা থাকলেও ভারতের নিবন্ধিত কারখানায় কর্মসংস্থান দুই কোটি ছাড়িয়েছে, সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন, মজুরি ও মূলধন।
ভারতের কারখানায় নতুন বিনিয়োগ কমলেও কর্মসংস্থানে রেকর্ড, বাড়ল শিল্পের উৎপাদন
ভারতের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক শিল্প জরিপে দেশটির নিবন্ধিত উৎপাদন খাতের সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩১টিতে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। চালু থাকা কারখানার সংখ্যাও ২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়ে ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৩টিতে পৌঁছেছে।
তবে নতুন বিনিয়োগের চিত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। মোট স্থায়ী মূলধন ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৫১ লাখ ১২ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকৃত মূলধনও ১১ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৭৫ লাখ ৫৬ হাজার কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একটি অর্থবছরে নতুন স্থায়ী সম্পদ তৈরিতে যে পরিমাণ অর্থ যুক্ত হয়েছে, সেই নতুন মূলধন গঠনের পরিমাণ প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ পুরোনো ও চলমান বিনিয়োগের মজুত বেড়েছে, কিন্তু নতুন করে সম্পদ তৈরির গতি কমেছে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মোট স্থায়ী মূলধন বাড়া মানেই ওই বছর নতুন কারখানা, নতুন যন্ত্রপাতি বা নতুন উৎপাদন সক্ষমতায় একই হারে অর্থ ঢুকেছে এমন নয়। স্থায়ী মূলধনের হিসাব আগের বিনিয়োগের মজুতও ধরে। বিপরীতে নতুন স্থায়ী মূলধন গঠন একটি নির্দিষ্ট সময়ে নতুন সম্পদ অর্জন ও নির্মাণের প্রবাহকে বোঝায়। তাই দুটি সূচকের গতিপথ ভিন্ন হওয়া সম্ভব।
নতুন বিনিয়োগে এই ধীরগতি কেন দেখা গেল, তার একটি সম্ভাব্য কারণ শিল্প বিনিয়োগের প্রকৃতি। ইস্পাত, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোনির্ভর শিল্পে বড় বিনিয়োগ অনেক সময় ধারাবাহিকভাবে না হয়ে কয়েকটি বড় প্রকল্পের মাধ্যমে একসঙ্গে আসে। ফলে কোনো একটি অর্থবছরে বড় প্রকল্পের ব্যয় বেশি হলে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়তে পারে, আবার পরের বছর নতুন প্রকল্পের ব্যয় তুলনামূলক কম হলে একই সূচকে পতন দেখা দিতে পারে। এ কারণে এক বছরের তথ্য দিয়ে ভারতের শিল্প বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পতনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
অন্যদিকে কর্মসংস্থানের চিত্র ছিল অনেক বেশি ইতিবাচক। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিবন্ধিত উৎপাদন খাতে মোট নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৭ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখে পৌঁছেছে। এক বছরে ১৪ লাখেরও বেশি মানুষ নতুন করে এই খাতে যুক্ত হয়েছেন। প্রথমবারের মতো নিবন্ধিত উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থান দুই কোটির সীমা অতিক্রম করেছে।
শুধু মোট কর্মসংস্থান নয়, সরাসরি কারখানা শ্রমিকের সংখ্যাও বেড়েছে। শ্রমিকের সংখ্যা ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৫৪ হাজারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ কেবল ব্যবস্থাপনা বা দাপ্তরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শ্রমিকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মজুরির ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। শ্রমিকদের মজুরি ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে এবং মোট পারিশ্রমিক ব্যয় বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে মাথাপিছু মোট পারিশ্রমিক বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অর্থাৎ কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়লেও প্রত্যেক কর্মীর আয় একই গতিতে বাড়েনি। এ বিষয়টি ভবিষ্যতে শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা ও শ্রমিকের প্রকৃত আয় বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
উৎপাদনেও ভারতের নিবন্ধিত শিল্প খাত ইতিবাচক ফল করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প উৎপাদন ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়েছে। মোট মূল্য সংযোজন বেড়েছে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং নিট মুনাফাও ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দুর্বলতা থাকলেও উৎপাদন, মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান ও মুনাফায় সামগ্রিক সম্প্রসারণ অব্যাহত ছিল।
ভারতের উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মৌলিক ধাতু, মোটরগাড়ি ও যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক পণ্য, ওষুধ এবং খাদ্যপণ্য। এই পাঁচটি শিল্প একসঙ্গে দেশের মোট উৎপাদন খাতের মূল্য সংযোজনের ৪৫ শতাংশের বেশি তৈরি করেছে। খাদ্যপণ্য খাত কর্মসংস্থানের দিক থেকে সবচেয়ে বড় নিয়োগদাতা ছিল। এরপর ছিল বস্ত্র ও মৌলিক ধাতু শিল্প।
রাজ্যভিত্তিক হিসাবেও বড় কয়েকটি রাজ্যের আধিপত্য রয়েছে। তামিলনাড়ুতে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে সংখ্যা ৪১ হাজার ২২১টি। এরপর গুজরাটে ৩৩ হাজার ৮৪টি এবং মহারাষ্ট্রে ২৭ হাজার ৩৭৯টি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানা সবচেয়ে এগিয়ে। এই পাঁচ রাজ্য মিলে দেশের নিবন্ধিত উৎপাদন খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৫৬ শতাংশের বেশি ধারণ করছে।
সামগ্রিকভাবে ভারতের শিল্প খাতের বর্তমান চিত্র তাই দ্বিমুখী। একদিকে নতুন স্থায়ী বিনিয়োগের গতি কমেছে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ নিয়ে কিছু প্রশ্ন তৈরি করছে। অন্যদিকে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামোতে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, মজুরি, মূলধন ও মূল্য সংযোজন সবকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই বৃদ্ধি হয়েছে।