কালিনিনগ্রাদ নিয়ে রাশিয়ার কঠোর বার্তা, বিচ্ছিন্ন করলে পরমাণু জবাবের হুমকি

কালিনিনগ্রাদকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো চেষ্টা হলে পরমাণু অস্ত্রসহ সর্বোচ্চ সামরিক সক্ষমতা ব্যবহারের সতর্কবার্তা দিয়েছে মস্কো। ন্যাটো অবশ্য বলেছে, তাদের কর্মকাণ্ড রাশিয়ার জন্য হুমকি নয়।

কালিনিনগ্রাদ নিয়ে রাশিয়ার কঠোর বার্তা, বিচ্ছিন্ন করলে পরমাণু জবাবের হুমকি

কালিনিনগ্রাদ নিয়ে রাশিয়ার কঠোর বার্তা, বিচ্ছিন্ন করলে পরমাণু জবাবের হুমকি


কালিনিনগ্রাদকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর রাশিয়া ন্যাটোকে পাঠানো একটি কূটনৈতিক নথিতে সতর্ক করে বলেছে, পশ্চিমা জোট যদি বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত রুশ ভূখণ্ড কালিনিনগ্রাদকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো চেষ্টা করে, তাহলে মস্কো তার হাতে থাকা সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা, পরমাণু অস্ত্রসহ, ব্যবহার করতে প্রস্তুত থাকবে। রয়টার্স নথিটি পর্যালোচনা করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

রাশিয়ার পাঠানো নথিতে ন্যাটোর কর্মকাণ্ডকে ‘বিপজ্জনক ও বেপরোয়া’ পথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। নথিতে আরও বলা হয়েছে, সংঘাত শুরু হলে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কেন্দ্রগুলোতে রুশ হামলার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে এটি কোনো হামলা শুরু হওয়ার ঘোষণা নয়; বরং কালিনিনগ্রাদকে বিচ্ছিন্ন করার সম্ভাব্য পরিস্থিতির ক্ষেত্রে রাশিয়ার ঘোষিত প্রতিক্রিয়া।

কালিনিনগ্রাদ রাশিয়ার একটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড, যা বাল্টিক সাগরের তীরে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য। ভৌগোলিকভাবে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া ও ন্যাটোর সামরিক উত্তেজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে রাশিয়ার নৌ, বিমান প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে।

রাশিয়ার সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার পেছনে ন্যাটোর সামরিক তৎপরতা নিয়ে মস্কোর উদ্বেগও রয়েছে। রাশিয়া দাবি করেছে, ন্যাটো কালিনিনগ্রাদকে ঘিরে সামরিক মহড়া ও বিভিন্ন প্রস্তুতির মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং অঞ্চলটিকে বিচ্ছিন্ন করার সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করছে। তবে ন্যাটো কালিনিনগ্রাদ অবরোধের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। রাশিয়ার কূটনৈতিক নথিতে থাকা এই দাবিকে তাই রাশিয়ার বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

ন্যাটো রাশিয়ার এই সতর্কবার্তার জবাবও দিয়েছে। জোটের মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট জানিয়েছেন, ন্যাটো রাশিয়ার কাছে একটি জবাব পাঠিয়েছে এবং সেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে ন্যাটো একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো কার্যক্রম বা সামরিক মহড়া রাশিয়ার কোনো অংশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে না। একই সঙ্গে ন্যাটো রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির ভাষারও নিন্দা জানিয়েছে।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটেও রাশিয়ার বক্তব্যের পর পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি ন্যাটোকে প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে তুলে ধরে রাশিয়াকে পরমাণু হুমকির ভাষা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ন্যাটোর ভূখণ্ডে রাশিয়ার কোনো তাৎক্ষণিক হামলার হুমকি তারা বর্তমানে দেখছেন না।

১ অক্টোবর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও কালিনিনগ্রাদ নিয়ে রাশিয়ার সতর্কবার্তা সম্পর্কে বলেন, এটিকে সংঘাত উসকে দেওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। মস্কোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইউরোপে সামরিকীকরণ বাড়ছে—এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া নিজেদের অবস্থান ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সতর্ক করছে। একই সময়ে পেসকভ বলেছেন, ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পরমাণু হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

কালিনিনগ্রাদকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক বিরোধও তীব্র হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ সার্বভৌম সম্পদ জব্দ রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়াও সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় কয়েকটি কোম্পানির রুশ সম্পদ সাময়িক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নেসলে, মেট্রো ও অশাঁর মতো ইউরোপীয় কোম্পানির রুশ সম্পদের ওপর এমন ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। মস্কো এসব পদক্ষেপকে ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেন-সংক্রান্ত নীতির পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছে।

ফলে কালিনিনগ্রাদ ইস্যুটি এখন শুধু একটি ভূখণ্ডকে ঘিরে বিরোধ নয়; এর সঙ্গে বাল্টিক অঞ্চলের সামরিক তৎপরতা, রাশিয়া-ন্যাটো সম্পর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং ইউরোপ-রাশিয়ার অর্থনৈতিক বিরোধও যুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন, এমন পরিস্থিতিতে সামরিক মহড়া, সীমান্তবর্তী ঘটনা বা ভুল হিসাব বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর