হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি যুবরাজের কঠোর বার্তা, নিরাপত্তায় আপস নয় রিয়াদের

হুথিসহ যেকোনো নিরাপত্তা হুমকির কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি যুবরাজের কঠোর বার্তা, নিরাপত্তায় আপস নয় রিয়াদের

হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি যুবরাজের কঠোর বার্তা, নিরাপত্তায় আপস নয় রিয়াদের


ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলা ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। ৩০ সেপ্টেম্বর রিয়াদে সৌদি শুরা কাউন্সিলের বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাদশাহ সালমানের পক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি বা হামলার দৃঢ় জবাব দিতে সৌদি আরব পিছপা হবে না। একই সঙ্গে তিনি উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও জানান।

মোহাম্মদ বিন সালমানের বক্তব্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলো দেখিয়েছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সৌদি আরব তার উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা, কৌশলগত সমন্বয় এবং যৌথ উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যাবে বলেও তিনি জানান।

ইয়েমেন প্রসঙ্গে সৌদি যুবরাজ দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি রিয়াদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। সৌদি আরব ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে এবং হুথিদের হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি। সৌদি ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর বক্তব্যে হুথিদের কর্মকাণ্ডকে ইয়েমেন ও পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

এই বক্তব্যের কয়েক দিন আগেই হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন হামলার দাবি করেছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর হুথি গোষ্ঠী রিয়াদে একটি কথিত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু এবং লোহিত সাগরের ইয়ানবু এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলার দাবি করে। এর আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ তায়েফ ও ইয়ানবু অভিমুখে ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল। তবে হুথিদের রিয়াদ ও ইয়ানবুর হামলার দাবি সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে এসব দাবিকে নিশ্চিত হামলা হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

হুথিদের সামরিক তৎপরতার প্রভাব শুধু সৌদি ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সৌদি যুবরাজ তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক জলপথকে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করেন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে বহুপক্ষীয় উদ্যোগের কথা জানান।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৭ আগস্ট তিন দেশ এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করা হবে।

৩০ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যে মোহাম্মদ বিন সালমান এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক প্রধানরাও রিয়াদে বৈঠক করে চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষা সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন।

পাকিস্তানও সৌদি নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেছেন, হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। তবে তিনি সৌদি আরবের হয়ে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানে পাকিস্তান সরাসরি অংশ নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ঘোষণা দেননি।

সৌদি যুবরাজের সর্বশেষ বক্তব্যকে নতুন যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে দেখার চেয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা অবস্থানের কঠোর পুনর্ব্যক্তি হিসেবে দেখা বেশি সঠিক। রিয়াদ একদিকে যেকোনো হামলার দৃঢ় জবাব দেওয়ার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, হুথি এবং তাদের সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে উত্তেজনা আরও বাড়বে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর