জেসুস বললেন রোনালদো অনুশীলন প্রত্যাখ্যান করেননি, তবু শিবির ছাড়লেন পর্তুগালের অধিনায়ক

জেসুসের দাবি, রোনালদো অনুশীলন প্রত্যাখ্যান করেননি; তবে বৈঠকের পর পর্তুগাল শিবির ছাড়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

জেসুস বললেন রোনালদো অনুশীলন প্রত্যাখ্যান করেননি, তবু শিবির ছাড়লেন পর্তুগালের অধিনায়ক

জেসুস বললেন রোনালদো অনুশীলন প্রত্যাখ্যান করেননি, তবু শিবির ছাড়লেন পর্তুগালের অধিনায়ক


পর্তুগালের জাতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও প্রধান কোচ জর্জ জেসুসকে নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনার মধ্যে নতুন মোড় এসেছে। জেসুস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, রোনালদো অনুশীলন করতে অস্বীকৃতি জানাননি। বরং তাঁর দাবি, রোনালদো কোচের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। তবে জেসুসের সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোনালদো পর্তুগালের জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ শিবির ছেড়ে চলে যাওয়ায় ঘটনাটি আরও আলোচনায় এসেছে। 

ঘটনাটি ঘটে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে। পর্তুগাল সেখানে উয়েফা নেশন্স লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর আগে নরওয়ের বিপক্ষে পর্তুগালের দুই-এক গোলের জয়ের ম্যাচে রোনালদো পুরো সময় বেঞ্চে ছিলেন। জেসুস তাঁকে মাঠে নামানোর জন্য প্রস্তুত করেছিলেন এবং রোনালদো দীর্ঘ সময় মাঠের পাশে গা গরমও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি। বিষয়টি নিয়ে রোনালদোর অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা জেসুস নিজেও স্বীকার করেছেন। 

এরপর সোমবার ও মঙ্গলবার রোনালদো দলের সঙ্গে নিয়মিত অনুশীলনে অংশ না নিয়ে আলাদা শারীরিক অনুশীলন করেন। পর্তুগিজ ফুটবল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, তিনি দলের সঙ্গে মাঠের অনুশীলনে ছিলেন না। তবে তাঁর শারীরিক সমস্যা বা চোট ছিল এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। জেসুসের ব্যাখ্যা ছিল, ম্যাচের পরের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে রোনালদোর জন্য আলাদা অনুশীলন পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তিনি জানান, আল নাসরের কোচ থাকাকালীনও রোনালদোর জন্য এমন ব্যবস্থাই করা হতো। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জেসুস সরাসরি অস্বীকার করেছেন যে রোনালদো অনুশীলন করতে চাননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, রোনালদো অনুশীলন প্রত্যাখ্যান করেননি এবং তাঁর অনুশীলনে যাওয়ার কথা ছিল। জেসুসের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে অযথা উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, রোনালদোর সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর কথা হয়েছে। 

রোনালদোর সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গে জেসুস যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রোনালদো তাঁকে বলেছেন, কোচ যদি খেলাতে চান তাহলে তিনি খেলবেন, বেঞ্চে বসাতে চাইলে সেখানেও থাকবেন এবং গ্যালারিতে পাঠালেও তিনি সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। অর্থাৎ জেসুসের বর্ণনা অনুযায়ী, রোনালদো কোচের সিদ্ধান্ত অমান্য করার অবস্থান নেননি। 

তবে এখানেই ঘটনার জটিলতা তৈরি হয়েছে। জেসুসের সংবাদ সম্মেলনের পর রোনালদো পর্তুগাল দলের প্রশিক্ষণ শিবির থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনও তাঁর শিবির ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। রোনালদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, জাতীয় দলের কোচের সংবাদ সম্মেলনের পর এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসার সঙ্গে কথা বলার পর তিনি শিবির ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা পরে পর্তুগালের জনগণকে জানাবেন। 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটি যদি হয়, রোনালদো সরাসরি অনুশীলন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাহলে জেসুসের বক্তব্য এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের তথ্য সেই দাবিকে সরাসরি সমর্থন করে না। জেসুস বলেছেন, রোনালদো অনুশীলন প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং তাঁর জন্য আলাদা শারীরিক অনুশীলনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রোনালদো দলের নির্ধারিত অনুশীলনে উপস্থিত না হয়ে শিবির ছেড়ে চলে গেছেন। তাই দুই ঘটনাকে এক করে বলা সঠিক হবে না। 

জেসুস আরও ব্যাখ্যা করেছেন, নরওয়ের বিপক্ষে রোনালদোকে মাঠে না নামানো ছিল তাঁর পরিকল্পনার অংশ। তিনি জানান, রোনালদো ও ব্রুনো ফের্নান্দেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের জন্য ম্যাচভিত্তিক শারীরিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। জেসুসের বক্তব্য অনুযায়ী, নরওয়ে ও ডেনমার্কের ম্যাচকে সামনে রেখে রোনালদোর ব্যবহারের বিষয়ে আগেই একটি পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত রোনালদোকে মাঠে নামানোর প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। 

জেসুস নিজের একটি সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নরওয়ের ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রোনালদোকে গা গরম করতে পাঠানো হয়েছিল। প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট তিনি প্রস্তুতি নেন। কিন্তু পরে জেসুস মনে করেন, ম্যাচের পরিস্থিতিতে রোনালদোকে মাঠে নামানোর প্রয়োজন নেই। কোচ স্বীকার করেছেন, রোনালদোকে একটু পরে গা গরম করতে পাঠানো হলে পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতে পারত। 

রোনালদোকে নিয়ে নিজের অবস্থানও পরিষ্কার করেছেন জেসুস। তিনি বলেছেন, একজন খেলোয়াড়ের অতীতের সাফল্য ও মর্যাদা অবশ্যই সম্মানের বিষয়, কিন্তু মাঠে কে খেলবেন, কে বেঞ্চে থাকবেন কিংবা কে গ্যালারিতে থাকবেন, সে সিদ্ধান্ত কোচের। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের সব খেলোয়াড়ের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত। 

ডেনমার্কের বিপক্ষে পর্তুগালের ম্যাচকে সামনে রেখে জেসুস আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, গনসালো রামোসকে শুরু থেকে খেলানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রোনালদোকে প্রয়োজনে ব্যবহার করা হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু রোনালদো শিবির ছেড়ে যাওয়ায় এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ থাকছে না। 

এদিকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ৪১ বছর বয়সী এই তারকা পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়। তাঁর আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা ১৪৬ এবং জাতীয় দলের হয়ে উপস্থিতি ২৩৪টি। ফলে জাতীয় দলের শিবির থেকে তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এখনই এটিকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর বিদায় হিসেবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। রোনালদো নিজেও তাঁর ঘোষণায় অবসরের কথা বলেননি। 

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসা পরিস্থিতি সামাল দিতে কোপেনহেগেনে গিয়েছিলেন। জেসুস ও রোনালদোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জেসুসের সংবাদ সম্মেলনের পর রোনালদোর শিবির ছাড়ার ঘটনা দেখাচ্ছে যে বিষয়টি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর