হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাধারণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাল ইয়েমেন সরকার

ইয়েমেনের সংকটে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে হুতি বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যবর্তী লড়াই আরও ঘনীভূত হয়েছে।

PostImage

হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাধারণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাল ইয়েমেন সরকার


দীর্ঘদিনের সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পর ইয়েমেনে চরম সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সাধারণ মানুষকে অস্ত্র ধারণ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। দেশের সংকটময় মুহূর্তে শাসন ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও বিদ্রোহী প্রতিরোধ জোরদার করাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি সম্প্রতি এক বিশেষ ভাষণে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এই জাতীয় বার্তা প্রদান করেন।  
লোহিত সাগর উপকূল থেকে সরকারি বাহিনীর পিছু হটার পর এটিই ছিল রশাদ আল-আলিমির প্রথম প্রকাশ্যে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। তিনি সাধারণ জনগণকে সব উপায়ে দেশের এই লড়াইয়ে অবদান রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। আল-আলিমি তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করে বলেন যে, তাঁদের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং রাজধানী সানাসহ পুরো দেশের ওপর সরকারের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। ২০১৪ সালে সানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল তৎকালীন ইয়েমেন সরকার। এরপর থেকে দেশের প্রধান প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।  


দেশের চরম এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেন সরকার একটি নমনীয় নীতিও গ্রহণ করেছে। আল-আলিমি ঘোষণা করেছেন যে, যেসকল হুতি যোদ্ধা বিদ্রোহী দল ত্যাগ করে সরকারের পক্ষে ফিরে আসবে, তাঁদের জন্য অবিলম্বে কার্যকর হওয়া সাধারণ ক্ষমা মঞ্জুর করা হবে। সরকারের ধারণা, এই ক্ষমার ঘোষণার মাধ্যমে হুতিদের সামরিক শক্তি অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জাতীয় ঐক্য পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।  


এই গণ-আহ্বানের পেছনে মূল কারণ ছিল সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম ইয়েমেনে হুতিদের ব্যাপক অগ্রযাত্রা। চলতি বছরে হুতি বিদ্রোহীরা ঐতিহাসিক কৌশলগত শহর মোখা এবং গুরুত্বপূর্ণ মেয়ুন দ্বীপ নিজেদের দখলে নেয়। এতে করে ইয়েমেন সরকার চরম সামরিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা ভেস্তে যাওয়ার পরেই এই নতুন সংঘর্ষ শুরু হয়। এই যুদ্ধবিরতির ফলে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চলা সশস্ত্র লড়াই কিছুটা থমকে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন করে সংঘটিত হওয়া সহিংসতা সেই সাময়িক শান্তিকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেয়।  


হুতিদের এই লোহিত সাগর উপকূলীয় অভিযান কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই প্রভাবিত করেনি, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও বড় হুমকি তৈরি করেছে। লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করা বাব আল-মানদেবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছে তারা। বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি কৌশলগত কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন জোগানো প্রতিবেশী সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সেখানে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।  


এই সংকটময় মুহূর্তে ইয়েমেনের সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রা আরও চরম হুমকির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। গৃহযুদ্ধের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে গৃহহীন হাজার হাজার পরিবার এখন নিরাপদ আশ্রয়, তীব্র খাদ্যসংকট এবং সুপেয় পানির অভাবে দিন কাটাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, ইয়েমেন সরকারের এই সাধারণ সমাবেশ ও সামরিক পুনর্গঠনের ডাক সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এই ক্ষমা ঘোষণা এবং সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করার কৌশল কতটা সফল হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূখণ্ডে শান্তি ফিরে আসে কি না।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর