গাজার ফিলিস্তিনিদের জীবন বদলাতে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ার উদ্যোগ সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা
গাজা পুনর্গঠনে নতুন উদ্যোগ, ফিলিস্তিনিদের জীবন বদলাতে অর্থনৈতিক সুযোগ ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরির বড় পরিকল্পনার কথা জানালেন জ্যারেড কুশনার।
গাজার ফিলিস্তিনিদের জীবন বদলাতে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ার উদ্যোগ সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা
গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, ফিলিস্তিনিদের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে বড় ধরনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা জ্যারেড কুশনার। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ২৩ সেপ্টেম্বর ‘বোর্ড অব পিস’-এর বৈঠকে তিনি গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
কুশনার বলেন, উদ্যোগটি শুধু একটি কোম্পানি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তৈরির বিষয় নয়। তার ভাষায়, লক্ষ্য হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা গাজার ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জীবিকা ও জীবনমান উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে এবং যারা শান্তিতে বসবাস করতে চান, তাদের সেই সুযোগ করে দেবে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার পুনর্গঠনের প্রথম ধাপে ছয় মাসের জন্য প্রায় ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের একটি কর্মসূচি প্রস্তাব করেছে। এতে মোট ৬৬টি প্রকল্প রয়েছে। অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতকে এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় অস্থায়ী আবাসন, ধ্বংসস্তূপ ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ, হাসপাতাল সংস্কার, রাস্তা মেরামত, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধার এবং সীমান্ত ক্রসিংগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে গাজার যোগাযোগব্যবস্থা, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
পুনর্গঠনের আর্থিক চাহিদাও বিশাল। ‘বোর্ড অব পিস’-এর হিসাব অনুযায়ী, গাজার শারীরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনে মাঝারি মেয়াদে প্রায় ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। আগামী এক দশকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য মোট ব্যয় প্রায় ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনার অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার, ধ্বংসস্তূপ ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণে ২৭৫ মিলিয়ন ডলার, হাসপাতাল পুনর্বাসনে ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং রাস্তা মেরামতে ৩০ মিলিয়ন ডলারের মতো বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
গাজার আবাসন সংকট মোকাবিলায়ও বড় উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৪ লাখ তাঁবুতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনির জন্য অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার প্রকল্প রাখা হয়েছে। তুরস্ক ৭০ হাজার মোবাইল বাড়ি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। মিসর ও কাতারের দেওয়া আরও ৫ হাজার মোবাইল বাড়ি গাজার সীমান্তের মিসরীয় অংশে অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
শিক্ষা খাতেও বড় ধরনের পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৩০০টি ভবনকে স্কুল হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা এবং অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যবস্থা পুনরায় চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালগুলো পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি, পানি ও অন্যান্য জরুরি পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গাজায় ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় চালু করা, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, গুদাম ও পরিবহন অবকাঠামো তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। একটি প্রযুক্তি পার্ক ও ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত।
রাফাহ সীমান্ত এলাকায় একটি সরবরাহ ও লজিস্টিক কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। এর মাধ্যমে মানবিক সহায়তা, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণ এবং বিতরণ আরও সংগঠিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে প্রবেশকারী পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়েও পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা রয়েছে। ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে একটি বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন নিরাপত্তা পরিস্থিতি, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত।
নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে। মার্কিন জেনারেল জ্যাসপার জেফার্স জানিয়েছেন, কয়েক ধাপে এই বাহিনী গাজার নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন এবং হামাসের সামরিক অবকাঠামো নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধাও রয়েছে। ‘বোর্ড অব পিস’ জানিয়েছে, প্রকল্পগুলো অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু করা যাবে। কিন্তু হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং গাজার নতুন প্রশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
অর্থায়নও একটি বড় প্রশ্ন। ফেব্রুয়ারির দাতা সম্মেলনে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এর মধ্যে মাত্র প্রায় ২৮০ মিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কুশনারের বক্তব্যে গাজার ভবিষ্যৎকে শুধু যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবিকা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতার ওপর।