নেতানিয়াহুর ভাষণে জাতিসংঘ ছাড়ল ইরান, সোলাইমানির ছবি রেখে জানাল প্রতীকী কূটনৈতিক প্রতিবাদ
নেতানিয়াহুর বক্তব্য শুরুর পর ইরানি প্রতিনিধিদল হল ছাড়ে, আসনে সোলাইমানির ছবি রেখে যুদ্ধ ও ইসরায়েলবিরোধী প্রতীকী বার্তা দেয় বিশ্বমঞ্চে জাতিসংঘে।
নেতানিয়াহুর ভাষণে জাতিসংঘ ছাড়ল ইরান, সোলাইমানির ছবি রেখে জানাল প্রতীকী কূটনৈতিক প্রতিবাদ
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় নাটকীয় প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নেতানিয়াহু জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে বক্তব্য শুরু করার আগে ইরানি প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। তবে তারা নিজেদের আসন পুরোপুরি খালি রেখে যায়নি। ইরানি প্রতিনিধিদলের নির্ধারিত আসনে রেখে যায় নিহত ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানির একটি বড় প্রতিকৃতি। ঘটনাটি দ্রুত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। রয়টার্সের প্রকাশিত ছবিতেও ইরানি প্রতিনিধিদলের খালি আসনের সামনে সোলাইমানির প্রতিকৃতি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ঘটনাটির তাৎপর্য বুঝতে হলে কাসেম সোলাইমানির পরিচয় এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাস বিবেচনা করতে হয়। সোলাইমানি ছিলেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কুদস ফোর্সের প্রধান। তিনি ইরানের আঞ্চলিক সামরিক ও নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হন।
সোলাইমানির মৃত্যু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাসে অন্যতম বড় সংঘাতের মুহূর্ত তৈরি করেছিল। ইরান দীর্ঘদিন ধরে ওই হত্যাকাণ্ডকে অবৈধ এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। জাতিসংঘের নথিতেও ইরান ২০২০ সালের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও মহাসচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে তেহরান সোলাইমানি হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে।
এই ইতিহাসের কারণেই জাতিসংঘের মঞ্চে সোলাইমানির ছবি রেখে যাওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত স্মরণ নয়; ইরানের রাজনৈতিক বার্তার অংশ হিসেবেও এর ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত চলার প্রেক্ষাপটে প্রতিকৃতিটির প্রতীকী গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
নেতানিয়াহুর ভাষণেও ইরান ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন এবং চলমান সংঘাতে ইসরায়েলের অবস্থান তুলে ধরেন। তার বক্তব্যের সময় শুধু ইরান নয়, আরও বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তুরস্ক, তিউনিসিয়া, সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়াসহ একাধিক দেশের প্রতিনিধিদের ওয়াকআউটের কথা উঠে এসেছে।
ফলে ইরানের পদক্ষেপটি বৃহত্তর একটি কূটনৈতিক প্রতিবাদের অংশও ছিল। তবে অন্য দেশগুলোর ওয়াকআউটের কারণ এক ছিল এমন দাবি করা ঠিক হবে না। প্রত্যেক দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান রয়েছে।
ইরানের জন্য ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেশটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মধ্যেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অংশ নিচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিসহ দেশটির শীর্ষ প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তেহরান একদিকে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আলোচনার আগ্রহের কথা জানিয়েছে, অন্যদিকে সামরিক চাপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও বজায় রেখেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহারের শর্তে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে। এর পাশাপাশি তেহরান কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগও খোলা রাখতে চাইছে। অর্থাৎ জাতিসংঘে সোলাইমানির ছবি রেখে যাওয়ার মতো প্রতীকী প্রতিবাদ এবং একই সময়ে আলোচনার দরজা খোলা রাখার নীতি দুটি বিষয়কে পাশাপাশি দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি শান্তিচুক্তি না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানোকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এই পরিস্থিতিতে সোলাইমানির ছবি রেখে ইরানি প্রতিনিধিদের বেরিয়ে যাওয়াকে একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখা যায়। ইরান মূলত বোঝাতে চেয়েছে নেতানিয়াহুর বক্তব্য শোনার পরিবর্তে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দৃশ্যমান করতে চায়। সোলাইমানি ইরানের রাষ্ট্রীয় বয়ানে এখনও প্রতিরোধ ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হন।
তবে ঘটনাটিকে যুদ্ধের নতুন সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাবে না। এটি মূলত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতীকী পদক্ষেপ। একইভাবে “সোলাইমানির ছবি দিয়ে ইরান জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে” এই বক্তব্যের চেয়ে “নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় ইরানি প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউট এবং সোলাইমানির প্রতিকৃতি রেখে যাওয়া” বর্ণনাটি বেশি নির্ভুল।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এমন একটি মঞ্চ যেখানে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তা, প্রতীক এবং কূটনৈতিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তারই একটি উদাহরণ। একদিকে যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে সম্ভাব্য আলোচনার ইঙ্গিত তেহরানের বর্তমান কূটনীতিতে এই দুই প্রবণতা একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে।