যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো সীমান্তে ড্রোন যুদ্ধে লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে কার্টেল দমন

যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো সীমান্তে নজরদারিতে ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো সীমান্তে ড্রোন যুদ্ধে লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে কার্টেল দমন

যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো সীমান্তে ড্রোন যুদ্ধে লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে কার্টেল দমন


যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো সীমান্তে এখন এক নতুন ধরণের আধুনিক সংঘাত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভূখণ্ডজুড়ে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার চিরাচরিত ব্যবস্থার বদলে এখন উভয় পক্ষই প্রাধান্য দিচ্ছে আকাশপথের যুদ্ধকে। মাদক পাচারকারী শক্তিশালী কার্টেলগুলোর ব্যবহৃত আধুনিক ড্রোন নেটওয়ার্কের মোকাবিলায় এবার সরাসরি মাঠে নেমেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। মার্কিন ভূখণ্ডে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার আকাশে মোতায়েন করা হয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী উচ্চ ক্ষমতার লেজার প্রযুক্তি। সীমান্ত টহল বাহিনীর চোখে ধুলো দিতে কার্টেলগুলোর এই ড্রোন ব্যবহারের কৌশলে বেশ বড় রকমের আঘাত হেনেছে মার্কিন বাহিনী।


মার্কিন সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকো ভিত্তিক পাচারকারী ও কার্টেল নেটওয়ার্কগুলো বেশ কিছুদিন ধরেই মার্কিন সামরিক সদস্য এবং সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর জওয়ানদের গতিবিধি ওপর নজর রাখতে ড্রোন ব্যবহার করছিল। ছোট আকারের মানববিহীন এই আকাশযানগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও অত্যন্ত আধুনিক ক্যামেরা ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তিতে সজ্জিত। এর মাধ্যমে সীমান্ত রক্ষীদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও পেট্রোলিং দল কোন দিকে যাচ্ছে তা খুব সহজেই পর্যবেক্ষণ করে অপরাধী চক্রগুলো। সীমান্ত পার করে অবৈধ মানবপাচার করা কিংবা সুবিধাজনক খালি পথ দেখে মাদকের চালান সীমানা পার করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ড্রোনগুলো কার্টেলগুলোর প্রধান চোখ হিসেবে কাজ করছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্যন্ত ছোট ছোট চালানে সরাসরি ড্রোন ব্যবহার করে আকাশপথে সীমানা পার করে মাদক পাঠাল হচ্ছিল বলেও তথ্য উঠে এসেছে।


এই মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি সামাল দিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষার কৌশল আমূল বদলে ফেলেছে। শুধু সাধারণ নজরদারি বা রাডার দিয়ে এই দ্রুতগতির অদৃশ্য হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই হুমকি ধ্বংস করতে মার্কিন যৌথ টাস্ক ফোর্স নতুন ধরণের কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা কার্যকর করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্পেশাল টাস্ক ফোর্স জানিয়েছে, আগস্টের শেষভাগে পরিচালিত একটি বড় ধরনের নিশাচর অভিযানে সেনাবাহিনী চালিত মাল্টিপারপাস হাই এনার্জি লেজার বা এএমপি-এইচইএল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এই বিশেষ লেজার রশ্বির আঘাতে শত্রুভাবাপন্ন তিনটি ড্রোনকে সরাসরি আকাশে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ধ্বংস করা এই ড্রোনগুলো সরাসরি মার্কিন টহল সেনা এবং সীমান্ত সুরক্ষা কর্মীদের জন্য জীবননাশের ও শারীরিক ক্ষতির বড় কারণ হয়ে উঠেছিল।


দক্ষিণ সীমান্তে অপরাধী চক্রের ড্রোন ভূপাতিত করতে এ ধরনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার প্রযুক্তির ব্যবহার এটাই প্রথম সরকারিভাবে স্বীকার করা ঘটনা। যদিও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিভাগ ড্রোনগুলো ঠিক সীমান্ত অঞ্চলের নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্টে ধ্বংস করা হয়েছে বা সেগুলো ঠিক কোন কার্টেল দলের মালিকানাধীন ছিল তা বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে আগস্টের ঘটনার পর সামরিক বাহিনীর প্রকাশ করা হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, সেপ্টেম্বর মাসের শুরু পর্যন্ত এই বিশেষ লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে অন্তত ১১টি কার্টেল সংশ্লিষ্ট ড্রোন নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে চলতি বছর জুড়ে বিভিন্ন কাইনেটিক ও নন-কাইনেটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনশরও বেশি শত্রু ড্রোনকে আকাশেই প্রতিহত করেছে মার্কিন নর্দার্ন কমান্ড। কেবল আগস্ট মাসেই শতাধিক হুমকি সৃষ্টিকারী ড্রোন নামানো হয়েছিল।
পেন্টাগনের যুদ্ধ বিষয়ক শীর্ষ এক কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সীমান্ত নিরাপত্তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিভিত্তিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে প্রায় ১০০টির মতো সন্দেহভাজন অপরাধী ড্রোন সফলভাবে মাটিতে নামিয়ে আনা হয়। এসব অভিযানে বহুমুখী কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক সিগন্যাল জ্যামার ও ডাইরেক্টেড এনার্জি অস্ত্রের সমন্বিত প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। এই ধরণের প্রযুক্তিভিত্তিক অভিযানে মেক্সিকোর সামরিক বাহিনী এবং তাদের সীমান্ত রক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় রক্ষা করে নিখুঁত অপারেশন চালানো হচ্ছে।


ছোট, কম দামি কিন্তু কার্যকারী চালকহীন আকাশযান ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধী চক্রগুলো দূর থেকেই মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সীমান্ত পারাপারের প্রধান পথগুলোতে টহল দলের অবস্থান লাইভ ট্র্যাকিং করার ক্ষমতা কার্টেলগুলোকে অনৈতিক সুবিধা এনে দিচ্ছিল। তবে এর জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষার দেয়াল তোলা হয়েছে। সেন্সর, রাডার, সিগন্যাল ইন্টারসেপশন, ইলেকট্রনিক জ্যামিং এবং সর্বশেষ লেজার রশ্বির এই ডাইরেক্টেড এনার্জি ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধীদের এই আকাশপথের চাল চালকে ব্যর্থ করার চেষ্টা চলছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্ত এখন এক প্রযুক্তিনির্ভর বিড়াল-ইঁদুর দৌড়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে। একদিকে অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি কিনে সীমান্তে নজরদারি করার ও সীমান্ত টহল ফাকি দেওয়ার চক্রান্ত করছে, আর অন্যদিকে মার্কিন প্রযুক্তিবিদ ও সামরিক জওয়ানরা তাদের ধরে ফেলতে ও নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে আরও উচ্চতর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি থাকছে। মার্কিন স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের মতে, ড্রোন ব্যবহারের এই ধারা সীমান্ত নিরাপত্তার সমীকরণকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
তবে তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কিছু অস্পষ্টতা এবং সতর্কতাও তৈরি হয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সীমান্তে শনাক্ত হওয়া প্রতিটি ড্রোনই যে একই উদ্দেশ্যে নজরদারি বা মাদক বহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল তা নয়। আবার আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী প্রতিটি ড্রোন সরাসরি সুনির্দিষ্ট কোনো মেক্সিকান কার্টেলের নিয়ন্ত্রণে ছিল কিনা—এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা মালিকানার তথ্য প্রকাশ প্রকাশ্যে আনা হয়নি। এর ফলে সীমান্ত এলাকার অনেক বেসামরিক বা সাধারণ বাণিজ্যিক ড্রোনের সীমান্ত সীমানায় চলে আসা এবং ড্রোনগুলোর প্রকৃত মালিকানা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এখনো সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে। তবুও মার্কিন প্রশাসনের মতে, সীমান্ত সুরক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনীর জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আকাশের যে কোনো সন্দেহভাজন ড্রোন প্রতিহত করাই এখন অগ্রাধিকার। আগামী দিনগুলোতে এই প্রযুক্তির লড়াই কোন দিকে মোড় নেয় এবং দুই দেশের সীমান্ত রাজনীতিকে তা কীভাবে প্রভাবিত করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর