ইরান যুদ্ধ থামাতে প্রস্তুত, সিদ্ধান্ত এখন যুক্তরাষ্ট্রের: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান
যুদ্ধ নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায় তেহরান; পেজেশকিয়ানের বার্তায় ওয়াশিংটনের ওপর যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বাড়ল।
ইরান যুদ্ধ থামাতে প্রস্তুত, সিদ্ধান্ত এখন যুক্তরাষ্ট্রের: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চলমান সংঘাতের অবসান নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তেহরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায় না এবং সংঘাত কখন শেষ হবে—সে সিদ্ধান্ত এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে। সাক্ষাৎকারটি বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর প্রচারিত হয়।
ফক্স নিউজের ‘Special Report with Bret Baier’ অনুষ্ঠানে পেজেশকিয়ানকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা ইরানের নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এটি শেষ করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরান যুদ্ধ শুরু করেনি; বরং বাইরের হামলার পর দেশটি আত্মরক্ষায় বাধ্য হয়েছে।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় পেজেশকিয়ান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রত্যাখ্যান করেন, অন্যদিকে আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তিনি বলেন, পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি হলে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। পেজেশকিয়ান দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন যে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়। তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র চায় না এবং প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম আরও নিম্নমাত্রায় নামিয়ে আনা ও আন্তর্জাতিক যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারেও প্রস্তুত।
এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর গভীর উদ্বেগ রয়েছে। পেজেশকিয়ানের সর্বশেষ বক্তব্যে তাই আলোচনার সম্ভাবনার পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার একটি সম্ভাব্য পথের কথাও উঠে এসেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুন মাসে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সমঝোতার ভিত্তিতে উভয় পক্ষ বৃহত্তর একটি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামরিক হামলা ও অবরোধের কারণে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরান এখনো চুক্তির পথে এগিয়ে যেতে আগ্রহী।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতেও পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি জুনের সমঝোতায় নিজের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসে, তাহলে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বক্তব্যকে হঠাৎ করে নেওয়া অবস্থান পরিবর্তনের চেয়ে আলোচনার জন্য তেহরানের ধারাবাহিক বার্তার অংশ হিসেবে দেখা যায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো কঠোর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের বক্তব্যেও একই সময়ে চাপ ও আলোচনার দুই ধরনের বার্তা দেখা যাচ্ছে।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ ও অবরোধ কমালে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু এবং হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়ার বাস্তব অগ্রগতি এখনো অনিশ্চিত।
পেজেশকিয়ানের সর্বশেষ বক্তব্যকে যুদ্ধের অবসানের জন্য সরাসরি শান্তিচুক্তির ঘোষণা বলা যাবে না। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় না, কিন্তু আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে নিজের শর্ত, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরান পরস্পরের শর্ত কতটা মেনে নিতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নিশ্চয়তা চাইছে, অন্যদিকে ইরান সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা কমানো এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দাবি জানাচ্ছে। ফলে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য যুদ্ধের অবসানের একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক জানালা খুললেও, সেটি বাস্তবে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তিতে রূপ নেবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।