“এআই ও চিপ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা তীব্র, বাড়ছে কৌশলগত উত্তেজনা”
এআই ও উন্নত চিপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা তীব্র, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ দখলে দুই দেশের কৌশলগত লড়াই ক্রমেই বাড়ছে।
“এআই ও চিপ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা তীব্র, বাড়ছে কৌশলগত উত্তেজনা”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির নেতৃত্ব কে দেবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন প্রযুক্তি খাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উন্নত এআই চিপ, কম্পিউটিং সক্ষমতা, ডেটা সেন্টার এবং অত্যাধুনিক এআই মডেলকে ঘিরে দুই দেশের প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে।
এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে উচ্চক্ষমতার সেমিকন্ডাক্টর। উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন, আর সেই শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস উন্নত এআই চিপ। যুক্তরাষ্ট্রের এনভিডিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে চীন বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে হুয়াওয়ে, আলিবাবা ও অন্যান্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজস্ব চিপ তৈরির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
চীনের অগ্রগতির একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো আলিবাবার নতুন এআই চিপ। প্রতিষ্ঠানটি ২২ সেপ্টেম্বর তাদের নতুন Zhenwu V900 চিপ উন্মোচন করে এবং দাবি করে, এটি আগের প্রজন্মের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি কর্মক্ষম। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি আরও বড় এআই মডেল তৈরির পরিকল্পনাও জানিয়েছে। আলিবাবার বর্তমান শীর্ষ মডেল Qwen3.8-Max-এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ১০ ট্রিলিয়ন প্যারামিটার পর্যন্ত মডেল প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
চীনের আরেকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েও এআই চিপ ও কম্পিউটিং অবকাঠামোতে দ্রুত এগোচ্ছে। চীনা বাজারে এনভিডিয়ার এআই চিপের উপস্থিতি কমার সঙ্গে দেশীয় চিপ নির্মাতাদের ভূমিকা বাড়ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এদিকে চীনের এআই সক্ষমতা বাড়ানোর পথে অন্যতম বড় বাধা যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ। ওয়াশিংটন উন্নত এআই চিপ এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি চীনে পৌঁছানো সীমিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি, সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি চীনের হাতে গেলে তা জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারে।
তবে এই নিয়ন্ত্রণ চীনের এআই উন্নয়ন পুরোপুরি থামাতে পারেনি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীনের DeepSeek ও Moonshot AI-এর মতো প্রতিষ্ঠান এমন মডেল তৈরি করছে, যেগুলো কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মডেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছে। একই সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের চিপ ব্যবহারের দিকে আরও বেশি ঝুঁকছে।
চীনা স্টার্টআপ DeepSeek-এর নিজস্ব এআই চিপ তৈরির উদ্যোগও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি চিপ তৈরি করছে, যা মূলত প্রশিক্ষিত এআই মডেল থেকে ব্যবহারকারীদের উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়া বা ইনফারেন্সের জন্য ব্যবহার করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে এনভিডিয়া ও অন্যান্য বিদেশি চিপের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো চীনের নিজস্ব প্রযুক্তি অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হওয়া। আগস্টে রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ধরনের কিছু চীনা ডেটা সেন্টার উপাদান আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত অপটিক্যাল ট্রান্সসিভারও রয়েছে।
তবে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এআই নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লাইফেংয়ের আলোচনায় এআই-সংক্রান্ত গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনার তথ্য পরস্পরকে জানানোর একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাবটির লক্ষ্য হলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এআই ঘটনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা।
এআই নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আক্রমণ, আর্থিক ব্যবস্থা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যবস্থায় ক্ষতি এবং জীববৈজ্ঞানিক অপব্যবহারের মতো বিষয় উঠে এসেছে। তবে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গভীর অবিশ্বাসের কারণে সহযোগিতার ক্ষেত্র এখনও সীমিত।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের আগেও এআই গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। দুই দেশের প্রস্তুতিমূলক আলোচনায় এআই নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। তবে উন্নত এআই চিপের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তখনও বড় বিরোধপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এআই প্রতিযোগিতা এখন শুধু কোন দেশ সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি করতে পারে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কে উন্নত চিপ তৈরি করবে, কে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক এআই অবকাঠামোর মান ও সরবরাহব্যবস্থায় কার প্রভাব বেশি থাকবে।
ফলে এআইকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা আগামী দিনে প্রযুক্তি শিল্পের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।