রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নজিরবিহীন ধস

বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ ও বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে কানাডার বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী ব্যানার হাতে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নজিরবিহীন ধস

রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নজিরবিহীন ধস


উত্তর আমেরিকার দুই চিরসংগোথ ও ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক আজ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বন্ধুত্ব, মুক্ত বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সুদৃঢ় সম্পর্ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের বিতর্কিত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, চড়া বাণিজ্য শুল্ক এবং রাজনৈতিক মন্তব্য দুই দেশের মধ্যকার গভীর আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কানাডার সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবার মধ্যেই এখন মার্কিন প্রশাসনের প্রতি তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছে।  


আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নীতি এবং কানাডার অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর আক্রমণ দুই দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করেছে। ট্রাম্প কেবল কানাডীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কই বসাননি, বরং প্রকাশ্যে কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর মতো অপমানজনক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। সার্বভৌম একটি দেশের আত্মমর্যাদায় এ ধরনের আঘাত কানাডীয় সমাজ ও রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অতীতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন হলেও, ট্রাম্পের সময়কালে যে কূটনৈতিক ক্ষত তৈরি হয়েছে তা অতি দ্রুত সারিয়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন কানাডার নীতি নির্ধারকরা।  
সম্পর্কের এই অবনতি শুধু সরকারের উচ্চপর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সাধারণ মানুষের মনোভাবের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত একাধিক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা ও জনমত জরিপে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা লেজার এর জরিপ অনুযায়ী, কানাডার প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ এখন নিজেদের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রু দেশ হিসেবে মনে করছেন। ঐতিহাসিকভাবে কানাডার মানুষ যে দেশটিকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অংশীদার হিসেবে দেখত, সেখানে এত বড় মানসিক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বিরল ঘটনা।  


এর পাশাপাশি গ্যালাপ পরিচালিত আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, কানাডার জনগণের কাছে মার্কিন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জরিপের তথ্যমতে, ওয়াশিংটনের মার্কিন প্রশাসনের প্রতি কানাডীয়দের সমর্থনের হার কমে মাত্র ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি গত বিশ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সর্বনিম্ন পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আমেরিকার প্রতি কানাডার মানুষের দীর্ঘদিনের ভরসা ও আস্থা কতটা গভীরভাবে হোঁচট খেয়েছে।  


কানাডার বিভিন্ন শহরে এখন সাধারণ নাগরিকরা রাজপথে নেমে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করছেন। তাঁদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্রতিবাদী ব্যানারে লেখা থাকছে—কানাডা বিক্রয়ের জন্য নয় এবং কানাডার স্বার্থ সবার আগে। তারা স্পষ্ট ভাষায় মার্কিন প্রশাসনের আগ্রাসী অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদ জানাচ্ছেন এবং নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সোচ্চার হচ্ছেন। নাগরিক আন্দোলন ও রাজপথের প্রতিক্রিয়া এটিই ইঙ্গিত করে যে, দুই দেশের এই কূটনৈতিক দূরত্ব কেবল সরকারি চিঠিপত্রের মাধ্যমে সমাধান করা সহজ হবে না।  


বিশ্লেষকদের ধারণা, অর্থনৈতিক লেনদেন হয়তো ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে পুনরায় সচল করা সম্ভব হবে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে কানাডীয়দের মনে যে মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে বহুবছর সময় লেগে যাবে। উত্তর আমেরিকার এই নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জোটের ভবিষ্যৎ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর