পুলিশের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার! একের পর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
দেশে হঠাৎ করেই নাশকতা, জ্বালাও পোড়াও, বিরোধী দলের রাজপথে আন্দোলন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লাগাতার ঝটিকা মিছিল, বিক্ষোভ, অন্যদিকে শতভাগ দৃঢ়তা নিয়ে স্বাভাবিক কাজ নিশ্চিত করতে পারছে না অনেক দায়িত্ববান পুলিশ সদস্যরা। ২৪ এর ৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া পুলিশের উপর নির্মম, নিশংস ঘটনা এখনো অনেকের ভেতর বড় দাগ কেটে আছে, ইচ্ছে করলেও ভুলে যেতে পারছে না সেই সময়ের ঘটনা প্রবাহ।
পুলিশের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার! একের পর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশ প্রেমিক আদর্শবান তরুণ মেধাবী সদস্যদের সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। তারপরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একের পর এক মিছিল প্রশ্নবিদ্ধ করছে গোয়েন্দা সংস্থার তদারকি বা যেখানে মিছিল হচ্ছে সে স্থানের থানার অফিসাররা কি ঘুমিয়ে থাকেন? এর ভেতর সবচেয়ে আলোচিত করে গুলশানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিছিলটি। দ্রুত মিঠিলটি ভাইরাল হয়ে যায়, শাস্তির আওতায় আসেন সেই থানার ওসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। অন্য দিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হলে তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়। নোয়াখালীর সেনবাগ থানার ওসির বিরদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতার বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ায়, তাকেও প্রত্যাহার করা হয়। সিএমপি কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু জায়েদ মোঃ নাজমুন নূরকে বিতর্কিত কর্মকান্ডে ষ্ট্যান্ড রিলিজ দেওয়া হয়। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদকে বরখাস্ত করা হয়। পুলিশের ভেতর সরকার নজরদারি বাড়িয়েছে। বিএনপিপন্থী পুলিশ সদস্যদের অন্তরালে কাজে লাগচ্ছে সরকার, আবার স্থানীয় বিএনপির নেতাদেরকেও থানার দিকে তদারকির পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
একটি সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রথম শক্তি হচ্ছে পুলিশ বাহিনী। তাই পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়াতে কাজ করছে সরকার। আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে যারা অতিরঞ্জিত কাজে সম্পৃক্ত ছিল বা আন্দোলনে সরকারের হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আনারক ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। তবে পুলিশের ভেতর এখনো একটি অংশ পুলিশ হত্যাকান্ডের বিচার নিশ্চিত করতে চায়, যদিও শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছে না, তবে ভেতরে নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে এ বিষয়ে আলোচনা করছেন বলে জানা যায়।রাজধানীর এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, আমাদের আর আগের মতো শক্তি নেই, সম্মান নেই। একজন আসামিকে ধরতে গেলেও বহু চিন্তা করতে হয়। পুলিশের আইজিপি বলেন, একজনের দায় সবার উপরে দেয়া ঠিক না। এখনো ৯৯℅ পুলিশ সাহসী এবং পরিশ্রমী, তারা রাষ্ট্রের জন্য নিবেদিত।
২০২৪ এর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় আরো যারা শাস্তির আওতায় এসেছেঃ
চাকরি থেকে স্থায়ী বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর এবং আইনি ট্রাইব্যুনালের আওতায় বাংলাদেশ পুলিশের বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাধারণ সদস্য বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে (বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি ও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) অসদাচরণ, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হয়েছে।শাস্তির আওতায় আসা প্রধান পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিচে দেওয়া হলো:১. বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির জন্য স্থায়ী বরখাস্ত (সেপ্টেম্বর ২০২৬)অনুমতি ছাড়া টানা ৬০ দিনের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং বিভাগীয় তদন্তে ‘অসদাচরণ ও পলায়ন’ প্রমাণিত হওয়ায় ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ৬ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে স্থায়ী বরখাস্ত করা হয়:মোহাম্মদ জায়েদুল আলম (সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি, রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত)মো. আসাদুজ্জামান (সাবেক পুলিশ সুপার, ঢাকা জেলা; সারদা পুলিশ একাডেমিতে সংযুক্ত)আরিফুর রহমান মণ্ডল (সাবেক পুলিশ সুপার, সিরাজগঞ্জ; বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত)মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন (সাবেক পুলিশ সুপার, অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট; বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত)পলাশ রঞ্জন দে (সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ৭ এপিবিএন, সিলেট)রাজীব দাস (সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি; থাইল্যান্ডে ছুটি কাটিয়ে আর কর্মস্থলে ফেরেননি)২. মানবতাবিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডিত ও বরখাস্তের প্রক্রিয়ায় থাকা কর্মকর্তাআন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ৯ জন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার আনুষ্ঠানিক সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই তালিকায় আছেন:চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন (সাবেক আইজিপি)হাবিবুর রহমান (সাবেক ডিএমপি কমিশনার)সৈয়দ নুরুল ইসলাম (সাবেক ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি)সুদীপ কুমার চক্রবর্তী (সাবেক যুগ্ম কমিশনার)মো. আসাদুজ্জামান (সাবেক ঢাকা জেলা এসপি)আবদুল্লাহিল কাফি (সাবেক অতিরিক্ত এসপি)শাহ আলম মো. আক্তারুল ইসলাম (সাবেক এডিসি)শহীদুল ইসলাম (সাবেক অতিরিক্ত এসপি, সাভার সার্কেল)মোহাম্মদ ইমরুল (সাবেক সহকারী কমিশনার)৩. বাধ্যতামূলক অবসর সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে বেশ কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:আতিকুল ইসলাম (অতিরিক্ত আইজিপি)মো. আনোয়ার হোসেন (ডিআইজি, পুলিশ সদর দপ্তর)মো. আসাদুজ্জামান (অতিরিক্ত কমিশনার, ডিএমপি)মনিরুল ইসলাম (সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ)হাবিবুর রহমান (সাবেক ডিএমপি কমিশনার)মনিরুজ্জামান (সাবেক কমিশনার, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ)আবদুল বাতেন (সাবেক ডিআইজি, রংপুর রেঞ্জ)৪. অন্যান্য বিভাগীয় শাস্তি ও অপসারণসঞ্চিত কুমার রায় (সাবেক ডিবির যুগ্ম কমিশনার): দায়িত্ব পালনে অনিয়ম এবং ঘুষের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মতো গুরুতর অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত করা হয়েছে।পলাতক ৫৭ কর্মকর্তা: কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক থাকা মোট ৫৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে ধাপে ধাপে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে সরকার জেলা ভিত্তিক মন্ত্রীদের দিয়ে কমিটি গঠন করেছে, সেই কমিটির দায়িত্ব প্রাপ্তরা সংগঠন ও প্রশাসন উভয় দিকে তদারকি করবেন ও শক্তিশালীও করবেন।তবে সূত্র বলছে, পুলিশের ভেতর এখনো অনেক কর্মকর্তারা আছেন যারা সঠিক দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট আন্তরিক না। আর এ কারণেই সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে উদ্বেগ বেশি।
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সোমবার দিবাগত রাতে এনসিপির বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, জুলাই সনদ মেনে নিলে কোথাও আর ককটেল ফুটবে না। তার এমন বক্তব্যও অনেকের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করছে যে তাহলে কি এতো ককটেলের কারণ এনসিপি? আবার ঢাকা থেকে রংপুর লং-মার্চে জামায়াতের আমির বর্তমান সরকারকে নব্য স্বৈরাচার আখ্যা দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন টাঙ্গাইলের জনসভায়।