নিউইয়র্কে ট্রাম্প–জিসিসি বৈঠক ইরান যুদ্ধ থামানো থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, কে কী চাইছে?
নিউইয়র্কে ট্রাম্প–জিসিসি বৈঠক ইরান যুদ্ধ থামানো, হরমুজের নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে বড় সমঝোতার খোঁজে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় নেতারা।
নিউইয়র্কে ট্রাম্প–জিসিসি বৈঠক ইরান যুদ্ধ থামানো থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, কে কী চাইছে?
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে। বৈঠকে ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইয়েমেনের হুতি সংকট এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গুরুত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে। ইরাক ও জর্ডানের কর্মকর্তাদেরও আলোচনায় যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
চলমান সংঘাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা। যুদ্ধের সময় ইরানের হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা আক্রান্ত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে অঞ্চলটির দেশগুলো এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো চাইছে, যেখানে ভবিষ্যৎ সংঘাতে তারা সরাসরি হামলার শিকার হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল ফিরিয়ে আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইয়েমেনের হুতিদের তৎপরতা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও চাপের মুখে রয়েছে। হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির পর সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের আরও সক্রিয় ভূমিকা চেয়েছে বলে দ্য ন্যাশনাল জানিয়েছে, যদিও ট্রাম্প প্রশাসন নতুন আরেকটি সামরিক ফ্রন্টে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
সৌদি আরবের জন্য ইয়েমেন পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির পাশাপাশি রিয়াদকে নিজস্ব জ্বালানি ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর নিরাপত্তাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কার্যকর নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর পথ—দুই বিষয়ই সৌদি হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কাতার তুলনামূলকভাবে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি নিউইয়র্কে বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার জন্য এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে কোনো দেশ স্থায়ীভাবে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় থাকবে না। কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার মধ্যস্থতাও চালিয়ে যাচ্ছে।
দোহা আরও দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রস্তাব সামনে এনেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেছেন, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর ভিত্তি তৈরি হতে পারে। তবে এর সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও থাকতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও উত্তেজনা কমানো ও আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘে আমিরাতের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আবুশাহাব বলেছেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও বাণিজ্যের নিরাপত্তা এবং অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করা তাদের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, ট্রাম্প ও জিসিসি নেতাদের বৈঠক আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন ও সংঘাত সমাধানের প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখতে পারে।
ওমানের জন্য হরমুজ প্রণালির সংকট এবং কূটনৈতিক মধ্যস্থতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। মাস্কাট ও তেহরানের মধ্যে হরমুজ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। অন্যদিকে জিসিসি দেশগুলো দ্রুত জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে এবং নিজেদের অর্থনীতিকে চলমান যুদ্ধের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে চাইছে।
বৈঠকটি এমন সময় হচ্ছে যখন ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ব্যয়, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক ক্ষতির কারণে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর কতটা নির্ভর করা উচিত, তা নিয়েও অঞ্চলটিতে আলোচনা চলছে।
ফলে নিউইয়র্কের এই বৈঠকে দুই পক্ষের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। ওয়াশিংটনের সামনে হরমুজ ও লোহিত সাগরের নৌপথ সুরক্ষিত রাখা এবং ইরান সংকটের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণের প্রশ্ন রয়েছে; অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানো, নিজেদের ভূখণ্ড ও অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে।