গ্রিনকার্ডপ্রত্যাশীদের নতুন দুশ্চিন্তা, সরকারি সুবিধা নিলে আটকে যেতে পারে আবেদন
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ নিয়ম কার্যকর, সরকারি সুবিধা নিলে গ্রিনকার্ডে প্রভাবের শঙ্কা; ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতে গেল নিউইয়র্কসহ ২২ রাজ্য।
গ্রিনকার্ডপ্রত্যাশীদের নতুন দুশ্চিন্তা, সরকারি সুবিধা নিলে আটকে যেতে পারে আবেদন
যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিনকার্ডের আবেদনকারী কিছু অভিবাসীর জন্য বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ নীতি। ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই নিয়মে কোনো আবেদনকারী ভবিষ্যতে সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, তা নির্ধারণে অভিবাসন কর্মকর্তাদের আগের তুলনায় বিস্তৃত বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়মটি ২০২২ সালের তুলনামূলক সীমিত ‘পাবলিক চার্জ’ বিধান বাতিল করেছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বা ডিএইচএসের বক্তব্য হলো, আগের নিয়মটি আইনের উদ্দেশ্য যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছিল না এবং কর্মকর্তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করেছিল। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের অধিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
‘পাবলিক চার্জ’ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের একটি ধারণা। কোনো বিদেশি নাগরিক ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন বলে মনে হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা নির্ধারণে বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে।
নিউইয়র্ক অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর বলছে, নতুন নিয়মের আওতায় এসএনএপি খাদ্যসহায়তা, স্বাস্থ্যবিমা এবং স্কুলের বিনামূল্যের খাবারের মতো সরকারি সুবিধার ব্যবহারও কর্মকর্তাদের বিবেচনায় আসতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যের আইনসম্মত সুবিধা গ্রহণও আবেদনকারীর মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে বলে নিউইয়র্কের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে মেডিকেইড বা খাদ্যসহায়তা গ্রহণ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রিনকার্ড বাতিল বা প্রত্যাখ্যান হবে। নতুন নিয়মে কর্মকর্তাদের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ডিএইচএসও বলেছে, নিয়মটি কাউকে সরকারি সুবিধা থেকে নাম প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেয় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সীমা। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগের সরকারি সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে ডিএইচএস ২০২২ সালের নিয়ম অনুযায়ী মূল্যায়ন করার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগের মেডিকেইড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ চিকিৎসাসেবা নয়, মূলত সরকারি ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার মতো নির্দিষ্ট বিষয় আগের নিয়ম অনুসারে বিবেচিত হবে।
নতুন নীতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বড় আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের নেতৃত্বে আরও ২১টি অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। তাদের দাবি, নতুন নিয়মটি ডিএইচএসকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়েছে এবং আইনসম্মত সরকারি সহায়তা গ্রহণের কারণে অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে ভয় তৈরি করবে।
নিউইয়র্ক সিটির নেতৃত্বেও আলাদা একটি মামলা হয়েছে। নিউইয়র্কের সঙ্গে শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো, সান্তা ক্লারা কাউন্টি, সিয়াটল ও কিং কাউন্টির মতো স্থানীয় সরকার এই আইনি চ্যালেঞ্জে যুক্ত হয়েছে। মামলাকারীরা আদালতের কাছে নতুন নিয়মটি বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ভিন্ন। ডিএইচএসের চূড়ান্ত বিধিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের নিয়মটি কংগ্রেসের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং ‘পাবলিক চার্জ’ নির্ধারণে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত করেছিল। প্রশাসন আত্মনির্ভরশীলতাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদায় যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কোন সরকারি সুবিধা কে গ্রহণ করছেন এবং সংশ্লিষ্ট আবেদন নতুন নিয়মের আওতায় পড়ে কি না—সেটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সব বাংলাদেশি অভিবাসী বা সব গ্রিনকার্ড আবেদনকারীর ওপর একইভাবে নিয়মটি প্রযোজ্য—এমন ধারণা ঠিক নয়। আবেদনকারীর অভিবাসন শ্রেণি, আবেদন করার সময় এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর আইনি প্রভাব আলাদা হতে পারে। তাই শুধু খবর দেখে আইনসম্মত স্বাস্থ্য বা খাদ্যসহায়তা বন্ধ করে দেওয়া উচিত কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে যোগ্য অভিবাসন আইনজীবী বা স্বীকৃত আইনি সহায়তা সংস্থার পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নজর থাকবে নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করা মামলার দিকে। আদালত নতুন নিয়ম বহাল রাখে, সাময়িকভাবে স্থগিত করে নাকি শেষ পর্যন্ত বাতিল করে—তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বহু অভিবাসী পরিবারের ভবিষ্যৎ আবেদনপ্রক্রিয়ার বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে।