আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রকাশ: জুলাই অভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জে ওসমানের নির্দেশে নারকীয় গণহত্যা

ট্রাইব্যুনালে নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে গণহত্যা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় সাক্ষীদের চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি রেকর্ড

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রকাশ: জুলাই অভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জে ওসমানের নির্দেশে নারকীয় গণহত্যা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রকাশ: জুলাই অভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জে ওসমানের নির্দেশে নারকীয় গণহত্যা


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচার কাজ চলাকালে দেওয়া সাক্ষ্যের তথ্যের সাথে পেশকৃত বিবরণ সত্য ও নির্ভুল। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ট্রাইব্যুনালে শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া চলাকালেই গত জুলাই-আগস্টের গণহত্যার ঘটনায় তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নারায়ণগঞ্জে ১০ জন নিহতের ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মাহমুদ হোসেন, মো. স্বাধীন মিয়া এবং মোশারফ বেপারী তাঁদের সাক্ষ্য প্রদান করেন।


নারায়ণগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড, সশস্ত্র হামলা ও নির্বিচার গুলির ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন তিন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনজনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীরা হলেন বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ও বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সভাপতি ৬০ বছর বয়সী মাহমুদ হোসেন, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এলাকার পোশাক কারখানা কর্মী ২৯ বছর বয়সী মো. স্বাধীন মিয়া এবং আন্দোলনের সময় গুলিতে প্রাণ হারানো রাকিবের বাবা ৬০ বছর বয়সী মোশারফ বেপারী। শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে অন্তত ১০ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।


ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে গিয়ে মাহমুদ হোসেন জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলা প্রত্যক্ষ করেন তারা। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিতর্কিত মন্তব্য এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো নারায়ণগঞ্জেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ১৯ জুলাই দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে তাঁর অনুসারীরা সশস্ত্র অবস্থায় চাষাঢ়া ও জলকুড়ি এলাকায় প্রবেশ করে এবং ছাত্র-জনতার ওপর ভয়াবহ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গুলি চালায়। ওই গুলিবর্ষণের ঘটনায় আদিল ও ইয়াসিনসহ বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। একইদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ডিআইটি রোডে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপ গুলিতে নিহত হয়। সাক্ষী মাহমুদ হোসেন জানান, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে মোবাইলে এই নৃশংসতার দৃশ্য ধারণ করেন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে আলামত হিসেবে সেই ভিডিও জমা দেন। জবানবন্দিতে তিনি হামলা ও গুলির ঘটনায় শামীম ওসমান ছাড়াও শাহ নিজাম, অয়ন ওসমান, তানভীর আহমেদ টিটু, ভিকি, আজমেরী ওসমান, রাজু আহমেদ, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ, সোহানুর রহমান শুভ ও শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদসহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন।


মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী মো. স্বাধীন মিয়া ট্রাইব্যুনালকে জানান, ১৯ জুলাই তারা মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে জলকুড়ি এলাকায় স্বৈরাচার বিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। সেসময় শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের অনুসারীরা ভারী অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালায়, যার ফলে আদিল ও ইয়াসিন সহ অনেকেই রক্তাপ্লুত হয়ে প্রাণ হারান। পরবর্তীতে ৪ আগস্ট চাষাঢ়ায় পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডাররা একযোগে বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও শটগানের গুলি ছোঁড়ে, যেখানে পুলিশের ছোঁড়া টিয়ারশেলের আঘাতে আন্দোলনকারী মাহমুদ হোসেনের পায়ের আঙুল গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আবু হাসান টিপু ছররা গুলিতে আহত হন।


আগস্টের ৫ তারিখে সংঘটিত নারকীয় অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে গিয়ে সাক্ষী মাহমুদ হোসেন ও স্বাধীন মিয়া জানান, ৫ আগস্ট সকালে মিশনপাড়া থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল চাষাঢ়ার দিকে এগোতে থাকলে স্থানীয় সাংবাদিক বিটিভি প্রতিনিধি হেলাল সতর্ক করেন যে সামনে শামীম ওসমান সশস্ত্র দলবল নিয়ে ওঁৎ পেতে আছে। মিছিলে থাকা নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে বিপ্লবীদের অন্যতম কর্মী বদিউজ্জামানকে টেনে-হিঁচড়ে আলাদা করে ফেলে ওসমানের বাহিনী। সেখানে শহীদ মিনার মোড়ে শামীম ওসমান নিজে উচ্চস্বরে "মার মার" বলে নির্দেশ দিলে তাঁর ক্যাডাররা লোহার রড, পাইপ ও গাছের ডাল দিয়ে বদিউজ্জামানকে নির্মমভাবে পেটাতে থাকে। বদিউজ্জামানকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হন মাহমুদ হোসেন। সংজ্ঞাহীন ও মারাত্মক আহত অবস্থায় বদিউজ্জামানকে স্থানীয় ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়ার পথে ওসমানের বাহিনীর বাধার মুখে অন্তত ছয়টি স্থানে থামতে হয়। টানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর কোনোমতে হাসপাতালের গেটে পৌঁছালে শামীম ওসমানের অনুসারী চন্নু মাস্টার রক্তে ভেজা বদিউজ্জামানকে ভ্যান থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। পরে আরও লোকজনকে সাথে নিয়ে বিকেল সোয়া চারটার দিকে হাসপাতালে ঢোকানো হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।


মামলার তৃতীয় সাক্ষী মোশারফ বেপারী তাঁর সন্তান হারানোর বেদনাবিধুর জবানবন্দি পেশ করেন। গত ২১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় আন্দোলনে গিয়ে গুলিতে নিহত হন তাঁর ছেলে রাকিব। মোশারফ বেপারী ট্রাইব্যুনালকে জানান, শামীম ওসমানের ছেলে, ভাতিজা ও আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের ছোঁড়া গুলিতে তাঁর ছেলে রাকিবের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। নিহত রাকিব ছিলেন তাঁদের পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এবং তাঁর অপর সন্তানটি একজন প্রতিবন্ধী।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল এই মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের দিন নির্ধারণ করেন। গণহত্যার মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশা করছেন নিহতদের স্বজন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীরা।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর