পাকিস্তানের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ স্কলারশিপ ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় তরুণদের প্রভাব

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন করে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সেই সম্পর্কের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি তরুণদের জন্য পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার সুযোগও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ‘নলেজ করিডোর’ স্কলারশিপ নিয়ে শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, প্রচারে যে সুবিধার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বিদেশে পড়তে গিয়ে অর্থের সংকটে পড়ার আশঙ্কায় অনেকে এখন দুশ্চিন্তায়। কূটনৈতিক সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায়ের চাপ কি শেষ পর্যন্ত পড়ছে তরুণদের ভবিষ্যতের ওপর?

পাকিস্তানের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ স্কলারশিপ ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় তরুণদের প্রভাব

পাকিস্তানের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ স্কলারশিপ ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় তরুণদের প্রভাব


বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই নানা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আবার বাড়তে শুরু করেছে।


আগের সরকারের সময় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে যোগাযোগের উদ্যোগ দেখা যায়। পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঢাকা সফর, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা এবং শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার উদ্যোগ সেই সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। এই নতুন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা।


বাংলাদেশের তরুণদের পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে শুরু হয় ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ কর্মসূচি। এর আওতায় পাঁচ বছরে ৫০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। চিকিৎসা, প্রকৌশল, কম্পিউটার সায়েন্স, ব্যবসা, গণযোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।


শুরুতে এই বৃত্তি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ এটি সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। অর্থাৎ টিউশন ফি, থাকার ব্যবস্থা, মাসিক ভাতা, বিমানভাড়া, বইপত্রসহ বিভিন্ন খরচ বহনের কথা বলা হয়।


অনেক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ পাওয়ার আশায় আবেদন করেন। পরীক্ষা দেন। কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচিতও হন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় পরের ধাপে।


নির্বাচিত কয়েকজন মাস্টার্স শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তাঁদের দেওয়া পরবর্তী তথ্য বা অফার লেটারে আগের প্রচারের সঙ্গে পুরোপুরি মিল পাওয়া যায়নি। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিউশন ফি ও আবাসনের সুবিধা থাকলেও মাসিক ভাতা, খাবার, যাতায়াত ও বিমানভাড়ার মতো সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


একজন শিক্ষার্থীর জন্য বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই বোঝা যায়। একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যখন বিদেশে পড়তে যান, তখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি নয়, থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, বিমানভাড়া এবং দৈনন্দিন খরচের বিষয়টিও আগে থেকে হিসাব করতে হয়।


বৃত্তির শর্ত যদি শুরুতে একরকম মনে হয়, কিন্তু পরে তা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা আসে, তাহলে শিক্ষার্থীর জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন।


শিক্ষার্থীরা যদি শুরুতেই জানতেন যে সব খরচ বহন করা হবে না, তাহলে অনেকেই হয়তো আবেদন করতেন না। কিন্তু আবেদন, পরীক্ষা ও বাছাইয়ের পর যদি সুবিধা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।


পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের অর্থ দেওয়ার পদ্ধতি স্নাতক শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। তবে যোগ্য শিক্ষার্থীরা সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা পাবেন বলেও জানানো হয়েছে।


অর্থাৎ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাস্তবে একজন শিক্ষার্থী ঠিক কী কী সুবিধা পাবেন, তা পরিষ্কারভাবে জানানো। আরেকটি বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন।


কিছু শিক্ষার্থী তাঁদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় বা শহরে পড়ার আশা করলেও শেষ পর্যন্ত অন্য প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ডিগ্রির মূল্য একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চাকরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।


তাই কোনো বৃত্তির সুযোগ পাওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের শুধু ‘ফ্রি স্কলারশিপ’ শুনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি কী, ডিগ্রিটি বাংলাদেশে কতটা গ্রহণযোগ্য, থাকার ব্যবস্থা কী, মাসিক খরচ কত এবং বৃত্তিতে কোন কোন খরচ দেওয়া হবে—সবকিছু পরিষ্কার থাকা দরকার। এখানে বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে।


বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যখন সরকারি বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোনো বৃত্তির মাধ্যমে বিদেশে পড়তে যাবেন, তখন তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি নজরে রাখা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়লে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দ্রুত সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।কারণ এটি শুধু একটি স্কলারশিপের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ।


বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন করে ঘনিষ্ঠ হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের সহযোগিতা স্বাভাবিক বিষয়।


তবে সেই সহযোগিতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তবে মানুষ কতটা উপকৃত হচ্ছে।


বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে সেটি পরিষ্কার ও লিখিত হওয়া দরকার। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শর্তের কোনো পরিবর্তন হলে সেটিও আগে জানানো জরুরি।


বাংলাদেশের তরুণরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ চান। তাঁরা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে চান। তাঁদের সেই স্বপ্ন যেন কোনো অস্পষ্ট শর্ত, ভুল বোঝাবুঝি বা আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়।


তাই বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রতিটি শিক্ষা চুক্তি ও বৃত্তি কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, লিখিত প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের সাফল্য শুধু বৈঠক, সফর বা চুক্তিতে নয়। সেই সম্পর্ক সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জীবনে কতটা বাস্তব সুযোগ তৈরি করছে—সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



আকিব হোসেন জাবির

[email protected]

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর