কিয়েভে রাতভর রুশ ড্রোন হামলা, নিহত চার; যুদ্ধ আরও ভয়াবহ মোড়ের দিকে
রাতভর রুশ ড্রোন হামলায় কিয়েভ অঞ্চলে চারজন নিহত; পাল্টা মস্কোতে ইউক্রেনের নজিরবিহীন হামলার পর সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা।
কিয়েভে রাতভর রুশ ড্রোন হামলা, নিহত চার; যুদ্ধ আরও ভয়াবহ মোড়ের দিকে
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আবারও ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলার নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ১৯ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর রাত এবং পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রুশ ড্রোন হামলায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিয়েভ অঞ্চলে একটি আবাসিক বাড়িতে রুশ ড্রোন আঘাত হানার পর এক মা এবং তাঁর তিন বছর বয়সী যমজ দুই সন্তান নিহত হন। অন্য একটি এলাকায় আহত এক শিশুও পরে হাসপাতালে মারা যায়। এতে ওই অঞ্চলে নিহতের সংখ্যা অন্তত চারজনে পৌঁছায়।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ওই রাতের অভিযানে রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের ১৩৮টি আক্রমণকারী ড্রোন পাঠায়। এর মধ্যে ১০১টি ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস বা প্রতিহত করেছে বলে দাবি করা হয়। তবে কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে কিয়েভ, দনিপ্রোপেত্রোভস্ক, ওডেসা, পোলতাভা, ভিন্নিতসিয়া ও জিতোমির অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা ছিল।
কিয়েভ অঞ্চলের ফাস্তিভ জেলা হামলার অন্যতম বড় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে সেখানে বাড়িঘর, শিল্প ও ইউটিলিটি স্থাপনা, কৃষি-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং যানবাহনসহ দুই ডজনের বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হতাহতদের উদ্ধারে কাজ করেন।
শুধু কিয়েভ নয়, ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকাতেও রুশ হামলার প্রভাব পড়েছে। সুমি অঞ্চলে একটি আবাসিক ভবনের কাছে হামলায় একজন নিহত ও আরেকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দোনেৎস্ক অঞ্চলেও গোলাবর্ষণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক আকাশ হামলা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল না; ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল একই সময়ে রুশ আক্রমণের মুখে পড়েছে।
তবে এই হামলার পেছনে আরও বড় একটি সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে নজিরবিহীন মাত্রায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে ১,৬০০টিরও বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে, যার প্রায় ৪৫০টি মস্কোমুখী ছিল। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন এটিকে রাজধানীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মস্কো অঞ্চলে ওই হামলায় একটি বড় তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আবাসিক ভবনেও আঘাত লাগে। রুশ কর্মকর্তাদের হিসাবে অন্তত দুজন নিহত এবং প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন; অন্য কিছু প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা তিনজন পর্যন্ত বলা হয়েছে। ফলে হতাহতের সংখ্যায় বিভিন্ন সূত্রের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনের শেষ দিনের সঙ্গে মস্কোতে এই ব্যাপক ইউক্রেনীয় হামলার সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রুশ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, হামলার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনী কার্যক্রম ব্যাহত করা। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার হামলা রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল ও লজিস্টিক অবকাঠামোতে আঘাত করেছে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মস্কো কিয়েভের বিরুদ্ধে হামলা আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং কিয়েভে আক্রমণ আরও তীব্র হতে পারে।
বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুই পক্ষই এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, নিজেদের প্রতিপক্ষের গভীর ভূখণ্ডে আঘাত করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইউক্রেন দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করছে। অন্যদিকে রাশিয়া বিপুল সংখ্যক ড্রোনের মাধ্যমে ইউক্রেনের শহর, শিল্প ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ফলে “রাশিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে না” এই রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি বাস্তব চিত্র হলো, দুই পক্ষই এখন পাল্টা আঘাতের মাত্রা বাড়াচ্ছে। এতে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকি আরও বাড়ছে এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কঠিন হয়ে পড়ছে।