হাসিনা থেকে ইউনূস, এবার তারেক! জাতিসংঘে বারবার উঠছে রোহিঙ্গা সংকট, মিলবে কি প্রত্যাবাসনের কার্যকর পথ?

হাসিনা থেকে ইউনূস, এবার তারেক!জাতিসংঘে বারবার রোহিঙ্গা সংকট, ২০ লাখ মানুষের প্রত্যাবাসনে মিলবে কি এবার কার্যকর সমাধানের পথ?

হাসিনা থেকে ইউনূস, এবার তারেক! জাতিসংঘে বারবার উঠছে রোহিঙ্গা সংকট, মিলবে কি প্রত্যাবাসনের কার্যকর পথ?

হাসিনা থেকে ইউনূস, এবার তারেক! জাতিসংঘে বারবার উঠছে রোহিঙ্গা সংকট, মিলবে কি প্রত্যাবাসনের কার্যকর পথ?


বাংলাদেশের সরকার ও নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে দেশের কাঁধে থাকা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা। শেখ হাসিনার সরকারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেছেন। এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিতে নিউইয়র্ক গেছেন তারেক রহমান। তাঁর সফরেও বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে সামনে থাকছে রোহিঙ্গা সংকট।

রোববারের সরকারি ব্রিফিং অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর সকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে ভাষণ দেবেন। তাঁর বক্তব্য বাংলায় দেওয়ার কথা রয়েছে। 

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ একাধিক বিষয়ের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট বিশেষভাবে স্থান পাবে। 

তবে রোহিঙ্গা ইস্যু শুধু সাধারণ পরিষদের ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইবেন। বাংলাদেশ এই আয়োজনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংকটটিকে আবার বিশ্বনেতাদের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাইছে। 

প্রশ্ন হচ্ছে—এত বছর জাতিসংঘে আলোচনা, আন্তর্জাতিক আহ্বান ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কেন বাস্তবে এগোয়নি?

এর অন্যতম বড় কারণ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও টেকসই। জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনাতেও দ্রুত, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর একটি হিসেবে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে ফেরত পাঠানো নয়; এমন পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা নিরাপদে এবং টেকসইভাবে বসবাস করতে পারবেন। 

এদিকে সংকটের মানবিক চাপ আরও বড় হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন, যাদের অধিকাংশই কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে বসবাস করছেন। মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। 

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ তৈরি হয়েছে। এ কারণে ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ১৬ লাখ মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। 

কিন্তু অর্থের সংকটও এখন বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও পুষ্টি কর্মসূচির জন্য ২০২৬ সালে তাদের প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারের অর্থঘাটতি ছিল। সংস্থাটি প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গাকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে। 

ফলে তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশের সামনে দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে—একদিকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ জোরদার করা, অন্যদিকে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ধরে রাখা।

এই লক্ষ্যেই সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। 

এ ছাড়া কুয়েতের যুবরাজ এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য-বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট আলোচনায় আসবে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। 

ফলে তারেক রহমানের এবারের নিউইয়র্ক সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটি শুধু একটি মানবিক সংকট হিসেবে নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবেও সামনে আসছে।

তবে জাতিসংঘের মঞ্চে বিষয়টি তুলে ধরা আর বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়া এক বিষয় নয়। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি প্রয়োজন যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে পারবেন। একই সঙ্গে মিয়ানমার, বাংলাদেশ, জাতিসংঘ এবং প্রভাবশালী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব বদলালেও রোহিঙ্গা সংকটের মৌলিক প্রশ্নটি একই থেকে গেছে—কক্সবাজারের শিবিরে থাকা প্রায় ২০ লাখ মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেই লক্ষ্য অর্জনে কতটা কার্যকর ভূমিকা নেবে?

তারেক রহমানের ২৩ সেপ্টেম্বরের রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানের বক্তব্য এবং ২৪ সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে সেই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের নতুন সরকারের কৌশল সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর