শুল্ক-যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ সংকট, করোনার চেয়েও কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা

শুল্ক, যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে আমেরিকার সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, করোনাকালের চেয়েও কঠিন পরিস্থিতিতে খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশটির ব্যবসায়ীরা।

শুল্ক-যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ সংকট, করোনার চেয়েও কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা

শুল্ক-যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ সংকট, করোনার চেয়েও কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা


যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা আবারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে এবারের সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—এখন সমস্যা শুধু পণ্য পাওয়া না-পাওয়া নয়; শুল্ক, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় এবং অনিশ্চিত সরবরাহ সময় একসঙ্গে ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা কঠিন করে তুলেছে।

ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টের চলতি বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো এখন খরচের পাশাপাশি সরবরাহ ঝুঁকিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, খরচ ও ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য এখন তাদের ক্রয়কৌশলের অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু মাত্র ৪৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মনে করে, তারা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত। জরিপটিতে বিশ্বের ৪২৫ জন সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পেশাজীবী অংশ নেন।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠেছে। আইএসএমের বিশ্লেষণে শুল্ককে এখন আর সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশের একটি স্থায়ী ও অনিশ্চিত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছেন সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি—বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় প্রভাবিত হয়েছে। এর ফলে জাহাজের পথ পরিবর্তন, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ যাত্রার কারণে কার্যকর পরিবহন সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। 

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রকাশিত জেনেটার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করলেও পরিস্থিতি এখনও সংকট-পূর্ব অবস্থায় ফেরেনি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চীন থেকে জেদ্দা এবং খোর ফাক্কানে কনটেইনার পরিবহনের তাৎক্ষণিক ভাড়া ফেব্রুয়ারির শেষের তুলনায় যথাক্রমে ২৫৬ শতাংশ ও ৪৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কিছু পথে এই ব্যয় করোনাকালের সর্বোচ্চ পর্যায়কেও ছাড়িয়েছে।

জ্বালানি পরিবহনেও চাপ অত্যন্ত তীব্র। চলমান ইরান সংঘাতের মধ্যে তেলবাহী বৃহৎ জাহাজের চাহিদা বেড়েছে এবং কিছু জাহাজের দৈনিক ভাড়া ১০ লাখ ডলারের বেশি উঠে গেছে। একই সময়ে হুতি হামলার ঝুঁকিতে কিছু জাহাজ বাব আল-মান্দেব এড়িয়ে কেপ অব গুড হোপের দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে। এর ফলে যাত্রার সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বাড়ছে। 

কেপ অব গুড হোপ দিয়ে ঘুরে গেলে কোনো কোনো রুটে প্রায় ১০ থেকে ১৪ দিন অতিরিক্ত সময় লাগছে। আগস্ট নাগাদ এই দীর্ঘ পথ ব্যবহারের কারণে বৈশ্বিক কনটেইনার বহরের আনুমানিক ৫ থেকে ৭ শতাংশ কার্যকর সক্ষমতা আটকে থাকার হিসাব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ জাহাজের সংখ্যা কমে যায়নি, কিন্তু একই জাহাজ একটি নির্দিষ্ট সময়ে আগের তুলনায় কম যাত্রা সম্পন্ন করতে পারছে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়তে পারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প সরবরাহকারী, একাধিক পরিবহনপথ কিংবা বড় মজুত ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি কিছুটা সামাল দিতে পারলেও ছোট প্রতিষ্ঠানের সেই আর্থিক সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।

আইএসএমের জুলাইয়ের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এখন ঝুঁকি বিভিন্ন দিক থেকে দ্রুত আসছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাই শুধু পণ্য কোথা থেকে কিনছে সেটি নয়, পরিবহন, গুদাম, বিক্রয় পরিকল্পনা এবং কাঁচামালের উৎস পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করছে। 

ফলে ২০২৬ সালের সরবরাহ সংকটকে শুধু পণ্যস্বল্পতার সমস্যা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। শুল্কের অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি পরিবহনের সংকট এবং দীর্ঘতর সমুদ্রপথ একসঙ্গে ব্যবসার খরচ ও পরিকল্পনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কিছু আন্তর্জাতিক রুটে পরিবহন ব্যয় ইতোমধ্যেই করোনাকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ায় মার্কিন ব্যবসায়ীদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—এই বাড়তি খরচ কতটা নিজেরা বহন করবেন এবং কতটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে হবে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর