যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা: স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ছেলেসহ নিহত তিন

গাজায় নতুন ইসরায়েলি হামলায় গাজার স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের ছেলেসহ নিহত তিন; ধ্বংসস্তূপ, জ্বালানি ও চিকিৎসাসংকটে চরম ঝুঁকিতে বেসামরিক ফিলিস্তিনিরা।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা: স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ছেলেসহ নিহত তিন

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা: স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ছেলেসহ নিহত তিন


যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও গাজা উপত্যকায় প্রাণঘাতী হামলা ও সহিংসতা থামার কোনো লক্ষণ নেই। শনিবার গাজার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে চালানো ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের ছেলেও রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে গাজার চিকিৎসাকর্মী ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের কাছে চালানো একটি সুনির্দিষ্ট ড্রোন হামলায় বাসির আল-বুরশ নামের এক তরুণ নিহত হন। বাসির গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডক্টর মুনির আল-বুরশের ছেলে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, বাসিরকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।


ঘটনার পর প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ডক্টর মুনির আল-বুরশ নিজে উপস্থিত থেকে কান্নাভেজা চোখে ছেলের মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। আল-বুরশ পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং দ্বিতীয় বড় আঘাত। এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে গাজায় চালানো এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় ডক্টর আল-বুরশের এক কন্যা নিহত হয়েছিলেন এবং সেই হামলায় তিনি নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন।


ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে শনিবারের এই সামরিক অভিযান ও হামলার কথা স্বীকার করা হয়েছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, তারা নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং বাসির আল-বুরশ তাদের উক্ত অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন। তবে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসের পক্ষ থেকেও ইসরায়েলি এই দাবির ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য বা বক্তব্য দেওয়া হয়নি।


একই দিনে গাজা উপত্যকার আরও কয়েকটি স্থানে পৃথক পৃথক হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শুজাইয়া এলাকায় চালানো একটি হামলায় এক ফিলিস্তিনি নাগরিক প্রাণ হারান। এ ছাড়া গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকায় একটি চলমান গাড়িকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হলে আরও একজন নিহত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, শেখ রাদওয়ানের ওই হামলায় তারা হামাসের এক সক্রিয় সদস্যকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।


ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও চরম মানবিক বিপর্যয়
গাজায় শুধু প্রত্যক্ষ সামরিক হামলাই নয়, যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো এখন বেসামরিক মানুষদের জন্য নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার গাজা সিটিতে অতীতে ইসরায়েলি হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া একটি বহুতল আবাসিক ভবন হঠাৎ ধসে পড়ে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ২১ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জন শিশু এবং পাঁচজন নারী ছিলেন।


আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির দীর্ঘ সময় পার হলেও গাজায় ক্ষতিগ্রস্ত আবাসনগুলোর বড় আকারের পুনর্গঠন বা সংস্কার কাজ শুরুই করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি-র তথ্যমতে, গাজা উপত্যকার প্রায় ৭৬ শতাংশ আবাসিক ভবনই পুরোপুরি ধ্বংস অথবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গাজা জুড়ে আরও দুই হাজারেরও বেশি ভবন যেকোনো মুহূর্তে পুরোপুরি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইসরায়েল সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজায় কোনো প্রকার বড় ধরনের পুনর্গঠন সামগ্রী বা নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না।

নতুন এসব হামলার পাশাপাশি গাজার স্বাস্থ্য খাত এখন নজিরবিহীন সংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের স্বাস্থ্যকর্মী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা জারি করেছেন। তাঁদের মতে, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ জেনারেটরের প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসার উপকরণের চরম ঘাটতির কারণে গাজার প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলো তাঁদের জরুরি চিকিৎসাসেবা যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারে।


বিশেষ করে আল-আওদা হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র, প্রসূতি বিভাগ এবং জরুরি অস্ত্রোপচার কক্ষগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি না সরবরাহ করা গেলে বহু আশঙ্কাজনক রোগী ও নবজাতকের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের দীর্ঘ দিন অতিক্রান্ত হলেও উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার চুক্তি লঙ্ঘনের মারাত্মক সব অভিযোগ এনে চলেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক সমাধানের প্রায় সমস্ত আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। একদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়মিত বিমান হামলা ও অভিযান, অন্যদিকে ভেঙে পড়া আবাসন ব্যবস্থা, স্থবির হয়ে থাকা পুনর্গঠন কাজ এবং হাসপাতালগুলোতে জ্বালানি ও চিকিৎসার ঘাটতি—সব মিলিয়ে গাজার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জন্য বেঁচে থাকা এক চরম চ্যালেঞ্জিং ও অনিশ্চিত বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর