হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় রিয়াদ, আকাশেই ধ্বংস করল সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী
হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় সৌদি রাজধানী রিয়াদ, আকাশেই ধ্বংস করল প্রতিরক্ষা বাহিনী; সংঘাত বাড়ায় শহরজুড়ে বেজে উঠল জরুরি সতর্কসংকেত।
হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় রিয়াদ, আকাশেই ধ্বংস করল সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত ও ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোরে এই ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর রিয়াদকে সরাসরি লক্ষ্য করে চালানো এটিই প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, হুতিদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি রিয়াদে পৌঁছানোর আগেই সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী সফলভাবে শনাক্ত করে ধ্বংস করে দেয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
হামলার আশঙ্কায় শুক্রবার গভীর রাত থেকে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় জরুরি বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। রিয়াদের বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে পাঠানো সতর্কবার্তায় আকাশপথে সম্ভাব্য হামলার হুমকির কথা জানিয়ে ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর রিয়াদে এ ধরনের সতর্কতা জারির ঘটনা এটিই প্রথম।
সতর্কতা জারির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকেরাও দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। পরে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কালো ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী দেখা যায়। বিমানবন্দরের কাছে সৌদি আরামকোর লোগো থাকা একটি জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগে এবং দমকলকর্মীরা পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এএফপি যাচাই করা ভিডিওতেও বিমানবন্দর এলাকার ওপর কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সঙ্গে ওই জ্বালানি ট্যাংকের আগুনের সরাসরি সম্পর্ক সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। ফলে আগুনের কারণ নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এদিকে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তারা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে দুটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। তাদের দাবি, একটি অভিযানে রিয়াদের ‘সংবেদনশীল স্থাপনা’ এবং অন্যটিতে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু শহরে সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়েছে। তবে রিয়াদে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, শুধু রিয়াদ নয়—বাইশ, তায়েফ, ফারাসান ও ইয়ানবুতেও বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল। সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলাও প্রতিহত করেছে বলে দাবি করেছেন জোটের মুখপাত্র।
ঘটনার প্রভাব পড়ে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রমেও। উড়োজাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ফ্লাইটরাডার২৪-এ কিছু সময়ের জন্য বিমানবন্দরটিতে বড় ধরনের বিঘ্নের তথ্য দেখা যায়। পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বিমান চলাচল শুরু হয়।
নতুন এই হামলা এমন সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনে হুতি বাহিনী ও সৌদি-সমর্থিত পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত আবার তীব্র হয়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটিতে পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর সংঘাত তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও চলতি বছর পরিস্থিতি আবার গুরুতর হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের সামরিক তৎপরতা এবং ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের বিস্তার নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি সীমান্ত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা সতর্কতা দিয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলেছে, সংঘাত দ্রুত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনার বিরুদ্ধে হামলার কারণে অঞ্চলটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় হুতিদের ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে।
রিয়াদে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এই চেষ্টা তাই শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতের নতুন অধ্যায় নয়; এটি ইয়েমেন যুদ্ধ আবার বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে ঘিরে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে—এমন উদ্বেগও সামনে এনেছে।