মেয়াদ শেষের আগেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ছুটি নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি

ওয়াশিংটনে নির্ধারিত সময়ের আগেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দীর্ঘ ছুটির পর রাজনৈতিক উত্তাপ এখন চরম তুঙ্গে।

মেয়াদ শেষের আগেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ছুটি নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি

মেয়াদ শেষের আগেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ছুটি নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি


ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস নির্ধারিত সময়ের আগেই অধিবেশন স্থগিত করে দীর্ঘ সাত সপ্তাহের বিরতিতে যাওয়ায় এক তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে আইনপ্রণেতাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে সরকারের অভ্যন্তরে এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। স্পিকার মাইক জনসন দাবি করেছেন, কংগ্রেস তার নির্ধারিত কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এবং এখন সদস্যদের জনগণের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার সময় এসেছে। কিন্তু বিরোধীদের মতে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ আইন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর মতো একাধিক জরুরি ইস্যু ঝুলিয়ে রেখে ক্যাপিটল হিল ত্যাগ করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। 

 
স্পিকারের বক্তব্য এবং বর্তমান পরিষদের অবস্থান নিয়ে বিশদ পর্যালোচনায় জানা যায়, বর্তমান পরিষদ শত শত বিল পাস করেছে। স্পিকার জনসন এক বিবৃতিতে জানান, ১৭৮৯ সালে মার্কিন আইনসভা গঠনের পর থেকে গণনায় এটি অন্যতম উৎপাদনশীল একটি কংগ্রেস। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনে বসে থাকার চেয়ে আইনপ্রণেতারা নিজ নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের কথা শুনলে দেশটি আরও বেশি উপকৃত হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আইনপ্রণেতারা কাজ শেষ করেই বিরতিতে গিয়েছেন এবং জাতীয় প্রয়োজনে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার নোটিশে তাঁদের আবারও ওয়াশিংটনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।  
তবে স্পিকারের এই দাবি সম্পূর্ণ সত্য নয় বলে তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট চেকিংয়ে দেখা গেছে। নিরপেক্ষ তথ্য যাচাইকারী মাধ্যম এবং মার্কিন কংগ্রেসের ঐতিহাসিক তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, এই কংগ্রেসকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা বা সর্বাধিক উৎপাদনশীল বলা হলেও বাস্তবে অনেক বড় বড় বিল পাসের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা রয়ে গেছে। বিশেষ করে আগের কয়েকটি কংগ্রেসের পাস করা মোট আইন ও বিলের তুলনায় বর্তমান প্রতিনিধি পরিষদের অনেক উদ্যোগই ভোটাভুটি পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি বা আটকে গেছে। ফলে স্পিকারের "দ্বিতীয় সর্বাধিক উৎপাদনশীল" দাবিটি রাজনৈতিক পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা পুরোপুরি সর্বসম্মত নয়।  


এই আকস্মিক বিরতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন প্রস্তাব। রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস মেসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাবটি বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কক্ষে ভোটাভুটির বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, ভোটাভুটি এড়াতেই নির্ধারিত সময়ের আগে তড়িঘড়ি করে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন স্পিকার। থমাস মেসি এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, দেশ যখন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ইরান সংঘাত ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে মানুষ চিন্তিত, তখন আইনসভা বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়া জনগণের সঙ্গে প্রতারণার সামিল। তিনি স্পিকারের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পুরো প্রক্রিয়াকে নীতিবহির্ভূত বলে আখ্যা দেন।  


অন্যদিকে স্পিকার জনসন ইমপিচমেন্টের এই উদ্যোগকে একটি রাজনৈতিক নাটক বা সস্তা প্রচারণামূলক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের আন্তর্জাতিক সামরিক টানাপোড়েন ও অস্থিরতার মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক খেলা খেলা একদমই অনুচিত। তিনি জানান, যখন কংগ্রেস পুনরায় বসবে, তখন প্রয়োজন মনে হলে এই বিষয়ে কথা বলা যাবে, কিন্তু এই মুহূর্তে এমন বিতর্ক তোলার কোনো মানে হয় না।  


ডেমোক্র্যাটিক দল এই আগাম ছুটির সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না। হাউস ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রিস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান নেতৃত্ব জনগণের মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাজারে পণ্যের চড়া দাম কমানোর জন্য আইন পাসের বাধ্যবাধকতা ছিল। ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা প্রমিলা জয়পাল বলেন, এই ছুটি আসলে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তারা ভয় পাচ্ছিল যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর অভিশংসন প্রস্তাবে দুই দলের অনেক সদস্যই সমর্থন দিতে পারেন, যা পাস হয়ে গেলে দলীয় ভাবমূর্তি নষ্ট হতো।  


ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন গঠনের প্রক্রিয়াও ঝুলে গেল এই সিদ্ধান্তের কারণে। ১০০ জনেরও বেশি ডেমোক্র্যাট সদস্য স্পিকারকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন যেন কোনোভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি কমানোর আইন না পাস করে ছুটি দেওয়া না হয়। কিন্তু সেই আবেদন গ্রাহ্য করা হয়নি। এ ছাড়া অন্যান্য কিছু প্রশাসনিক নীতি, জেফরি এপস্টাইন সম্পর্কিত তদন্ত নথি প্রকাশ এবং জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষা সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খসড়া প্রস্তাব ভোটাভুটির মুখ দেখেনি।  


কূটনৈতিক ও ঘরোয়া রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, এই ছুটির মূল অনুঘটক হলো ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রতিনিধি পরিষদের আইনপ্রণেতারা আগামী নির্বাচনে নিজ নিজ আসনে বিজয়ী হতে এখন মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা চালানোকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। সাধারণ ভোটারদের কাছে গিয়ে নিজের কাজ তুলে ধরা ও দলের অবস্থান পরিষ্কার করা তাঁদের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটনে আইনসভার ভেতরের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে আটকে থাকলে নির্বাচনী প্রচারণায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।  


নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই কেবল প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটনে ফিরবেন। তত দিন পর্যন্ত মার্কিন রাজনীতির জল ঘোলাই থাকছে। একদিকে স্পিকার শত শত বিল পাসের সাফল্য দাবি করে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা অসমাপ্ত কাজের পাহাড় এবং জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে ভোটারদের কাছে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠদের ব্যর্থতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণ আইনপ্রণেতাদের এই সময়ের আগেই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্তকে কীভাবে নেয়, তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাবে আসন্ন নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর