জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে বদলে যাচ্ছে নিউইয়র্ক, নিরাপত্তা প্রস্তুতি জানালেন মেয়র মামদানি
বিশ্বনেতাদের আগমনে নিরাপত্তার চাদরে নিউইয়র্ক। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ সামনে রেখে হাজারো পুলিশ মোতায়েন, ড্রোন–আকাশপথেও বিশেষ নজরদারি।
জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে বদলে যাচ্ছে নিউইয়র্ক, নিরাপত্তা প্রস্তুতি জানালেন মেয়র মামদানি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের পর্ব সামনে রেখে কার্যত নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হচ্ছে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের আগমন ঘিরে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিসসহ ২০টির বেশি সংস্থা সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি ১৭ সেপ্টেম্বর ওয়ান পুলিশ প্লাজায় এক নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ে এসব প্রস্তুতির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এনওয়াইপিডি কমিশনার জেসিকা টিশ, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ও ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
মামদানি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, কূটনীতিক, অধিকারকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি নিউইয়র্কে আসবেন। ইস্ট রিভারের পাশে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে তাঁরা বৈঠক, বিতর্ক ও আলোচনায় অংশ নেবেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক কূটনৈতিক সমাবেশের স্বাগতিক শহর হিসেবে নিউইয়র্কের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মেয়র জানান, এত বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি একসঙ্গে নিউইয়র্কে অবস্থান করায় নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। সিটি হল এবং এনওয়াইপিডি গত কয়েক মাস ধরে ফেডারেল নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কিংবা নিউইয়র্ক সিটির বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকির তথ্য নেই বলে স্পষ্ট করেছেন মামদানি ও পুলিশ কমিশনার টিশ। তা সত্ত্বেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিরাপত্তার মাত্রা বাড়ানো হচ্ছে।
নিউইয়র্কবাসী আগামী কয়েক দিনে শহরজুড়ে পুলিশের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে দেখবেন। বিশেষ করে জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও ম্যানহাটনের ইস্ট সাইডে নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হবে।
এনওয়াইপিডি কমিশনার জেসিকা টিশ জানান, জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও আশপাশে হাজার হাজার ইউনিফর্মধারী পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন থাকবেন। তাঁদের সহায়তায় থাকবে ভারী অস্ত্রসজ্জিত বিশেষ দল, বিমান ইউনিট, হারবার ইউনিট, কে-নাইন দল, বোমা স্কোয়াড, ড্রোন দল এবং সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তারা। নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছু অংশ দৃশ্যমান হলেও অনেক ব্যবস্থাই সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকবে।
সিক্রেট সার্ভিসের নিউইয়র্ক কার্যালয়ের কর্মকর্তা ম্যাট ম্যাককুল জানান, পুরো নিরাপত্তা অভিযানে ২০টির বেশি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে ‘ন্যাশনাল স্পেশাল সিকিউরিটি ইভেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিসের পক্ষ থেকেও বড় আকারের জনবল মোতায়েন করা হচ্ছে। তাদের ৬০০-এর বেশি বিশেষ এজেন্টের সঙ্গে আরও প্রায় ১০০ ফেডারেল এজেন্ট যুক্ত হবেন। ৫০টির বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের বিদেশি অতিথির নিরাপত্তায় তাঁরা কাজ করবেন।
নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আকাশপথ। ২০ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের দুই নটিক্যাল মাইলের মধ্যে সাময়িক বিমান চলাচল বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। অনুমোদনহীন ড্রোনও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। বিধিনিষেধ অমান্যকারী ড্রোন শনাক্ত ও মোকাবিলায় এনওয়াইপিডির বিশেষ কাউন্টার-ড্রোন দল মোতায়েন থাকবে।
শুধু আকাশ নয়, ইস্ট রিভারের জাতিসংঘ সদর দপ্তরসংলগ্ন অংশেও বিশেষ বিধিনিষেধ থাকবে। মার্কিন কোস্ট গার্ড এবং এনওয়াইপিডির হারবার প্যাট্রোল সেখানে নজরদারি করবে।
বিশ্বনেতাদের চলাচলের কারণে ম্যানহাটনে বড় ধরনের যানজটের আশঙ্কাও রয়েছে। ২১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটির পরিবহন বিভাগ ‘গ্রিডলক অ্যালার্ট’ জারি করেছে বলে মেয়র জানান। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের মোটরকেড চলাচলের সময় একাধিক সড়কে সাময়িকভাবে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল বন্ধ করা হবে। এফডিআর ড্রাইভের কিছু অংশও নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ থাকতে পারে।
২০ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ফার্স্ট অ্যাভিনিউর ৪১তম থেকে ৪৮তম স্ট্রিট পর্যন্ত এবং ৪৪তম থেকে ৪৭তম স্ট্রিটের ফার্স্ট ও সেকেন্ড অ্যাভিনিউয়ের মধ্যবর্তী অংশে বিধিনিষেধ থাকবে। বৈঠক চলাকালে প্রতিদিন প্রায় রাত ৯টা পর্যন্ত ৪২তম স্ট্রিটের ফার্স্ট থেকে সেকেন্ড অ্যাভিনিউ অংশ বন্ধ থাকবে এবং এফডিআরের ৪২তম স্ট্রিট এক্সিটও বন্ধ রাখা হবে।
এ কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে সাবওয়ে ও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন মামদানি। পাশাপাশি ম্যানহাটনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় হাতে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এবারের অধিবেশন ঘিরে প্রতিদিন একাধিক বিক্ষোভেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে এনওয়াইপিডি। কমিশনার টিশ বলেন, সাধারণ পরিষদের সময় নিউইয়র্কে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক এবং এবারও প্রতিদিন একাধিক কর্মসূচি হতে পারে। পুলিশ শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ ও বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করবে, তবে সহিংসতা, সম্পত্তি ধ্বংস বা আইন লঙ্ঘন সহ্য করা হবে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে সম্ভাব্য বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা নিয়েও ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন ওঠে। মামদানিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু নিয়ে তাঁর বক্তব্যের ভাষা পরিবর্তনের জন্য এনওয়াইপিডি থেকে কোনো অনুরোধ করা হয়েছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, পুলিশের সঙ্গে তাঁর আলোচনা ছিল সাধারণ পরিষদের স্বাভাবিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েই।
কমিশনার টিশ জানান, প্রতিবাদ আয়োজকদের সঙ্গে অনুমতি ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পুলিশের কমিউনিটি অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো যোগাযোগ করছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কাছাকাছি কিছু ‘ফ্রোজেন জোন’ থাকবে, যেখানে সাধারণ যানবাহন ও পথচারীর প্রবেশ সীমিত করা হবে। তবে এ বছরের ব্যবস্থা আগের বছরগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক কিছু নয় বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সূচি অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের মূল সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বক্তব্য চলবে ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং আবার ২৮ সেপ্টেম্বর। জলবায়ু, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং পরমাণু অস্ত্র বিলোপসহ বিভিন্ন বিষয়ে পৃথক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও নির্ধারিত রয়েছে।
সব মিলিয়ে কয়েক দিনের জন্য নিউইয়র্ক আবারও বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। মামদানির ভাষায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এমন বৃহৎ আয়োজনের স্বাগতিক হতে পারা নিউইয়র্কের জন্য সম্মানের। একই সঙ্গে শহরের বাসিন্দা, বিদেশি প্রতিনিধি ও অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁর প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।