আকাশযুদ্ধে শক্তি বাড়াচ্ছে সৌদি, চীনা উইং লুং-৩ ঘিরে ৫০০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা

চীনা সিএইচ-৪ ও উইং লুং ড্রোন ব্যবহারের পর এবার সৌদি আরবেই অত্যাধুনিক উইং লুং-৩ তৈরির বড় পরিকল্পনার খবর সামনে এসেছে।

আকাশযুদ্ধে শক্তি বাড়াচ্ছে সৌদি, চীনা উইং লুং-৩ ঘিরে ৫০০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা

আকাশযুদ্ধে শক্তি বাড়াচ্ছে সৌদি, চীনা উইং লুং-৩ ঘিরে ৫০০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা


মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক প্রযুক্তির বাজারে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে সৌদি আরব। দীর্ঘদিন ধরে চীনের তৈরি সিএইচ-৪ এবং উইং লুং সিরিজের ড্রোন ব্যবহার করা দেশটি এবার নিজ ভূখণ্ডে নতুন প্রজন্মের উইং লুং-৩ যুদ্ধ ড্রোন উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। আলোচিত প্রকল্পটির মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে রিয়াদ বা বেইজিং এখনো এই ৫০০ কোটি ডলারের চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। 

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের জেদ্দায় উইং লুং-৩ ড্রোনের একটি উৎপাদন লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বিমান নির্মাতা এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন অব চায়না এবং সৌদি আরবের সামরিক শিল্প কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৪৮টি উইং লুং-৩ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। 

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজও মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে ৫০০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পের খবর উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরব উইং লুং-৩ প্ল্যাটফর্মের প্রথম গ্রাহক হতে পারে। 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টে এমনভাবে দাবি করা হচ্ছে যেন সৌদি আরব সিএইচ-৪, উইং লুং সিরিজ ও উইং লুং-৩ কেনার জন্য মোট ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য সেই বক্তব্য সমর্থন করে না। ৫০০ কোটি ডলারের অঙ্কটি মূলত ২০২৬ সালে প্রকাশিত উইং লুং-৩-এর সৌদি উৎপাদন লাইন স্থাপনের প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

সৌদি আরবের চীনা ড্রোন ব্যবহারের ইতিহাস অবশ্য এক দশকেরও বেশি পুরোনো। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকেই চীনা ড্রোন সৌদি আরবে সরবরাহ শুরু হয়। সিপ্রির ২০১৮ সালের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, ২০১৪ সাল থেকে চীনের ইউএভি সৌদি আরবে সরবরাহ করা হয়েছে। 

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ২০১৪ সালে চীনের সিএইচ-৪ ড্রোন সংগ্রহ করে। পরবর্তী সময়ে দেশটি উইং লুং সিরিজের ড্রোনও সংগ্রহ করে। আর আল-মনিটরের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব বর্তমানে চীনের তৈরি সিএইচ-৪ এবং উইং লুং-২ পরিচালনা করছে। 

চীনের সিএইচ-৪ ও উইং লুং মূলত দীর্ঘ সময় আকাশে থেকে নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর জন্য তৈরি মানববিহীন আকাশযান। এসব ড্রোনের কারণে যুদ্ধবিমান বা পাইলটকে সরাসরি ঝুঁকিতে না ফেলেও দীর্ঘ সময় একটি অঞ্চল পর্যবেক্ষণ এবং অস্ত্র বহনকারী সংস্করণ দিয়ে হামলা পরিচালনা করা সম্ভব।

চীনা ড্রোনের প্রতি সৌদি আরবের আগ্রহের পেছনে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ বৈচিত্র্যময় করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সিপ্রি আগেই উল্লেখ করেছিল, চীনা ড্রোন কেনা সৌদি আরবের পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে অস্ত্রের উৎস বিস্তৃত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। 

অন্যদিকে চীনা ড্রোন নির্মাতাদের একটি সুবিধা হচ্ছে, পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে তারা দ্রুত সরবরাহ এবং তুলনামূলক কম রাজনৈতিক ও রপ্তানি বিধিনিষেধের মধ্যে সশস্ত্র ড্রোন বিক্রি করেছে। আল-মনিটরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো অতীতে দ্রুত এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ীভাবে সশস্ত্র ড্রোন পাওয়ার জন্য চীনের দিকে ঝুঁকেছিল। 

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে নতুন উইং লুং-৩ প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি কেবল বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে উঠবে। অর্থাৎ চীন থেকে সম্পূর্ণ তৈরি ড্রোন আমদানির পাশাপাশি দেশটি স্থানীয় সামরিক শিল্পও সম্প্রসারণ করতে পারবে।

এটি সৌদি আরবের সামরিক শিল্প স্থানীয়করণের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি বড় অংশ দেশের ভেতরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

চীনের জন্যও সম্ভাব্য উইং লুং-৩ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। সিএইচ-৪ এবং উইং লুং সিরিজের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ড্রোন বাজারে বেইজিং ইতোমধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। সিপ্রির তথ্যের ভিত্তিতে সিএসআইএসের চায়নাপাওয়ার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চীনা ড্রোনের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই সময় চীনের মোট ড্রোন বিক্রির প্রায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ সৌদি আরবের কাছে গিয়েছিল। 

তবে সৌদি আরবকে বর্তমানে নিঃশর্তভাবে “মধ্যপ্রাচ্যে চীনা ড্রোনের সবচেয়ে বড় ক্রেতা” বলা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়সীমা ও ড্রোনের ধরন অনুযায়ী হিসাব বদলে যায়। উদাহরণ হিসেবে ২০০৮-২০১৮ সময়কালের সিএসআইএস তথ্যেই চীনা ড্রোনের ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশ সৌদি আরবের চেয়ে বেশি ছিল। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ৫০০ কোটি ডলারের প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অবস্থান। আল-মনিটর জানিয়েছে, মার্চে সৌদি আরব ও চীনের মধ্যে এই পরিমাণ অর্থের উইং লুং-৩ উৎপাদন প্রকল্পের খবর প্রকাশিত হলেও চীন বা সৌদি আরবের সরকার প্রকাশ্যে চুক্তিটি নিশ্চিত করেনি। ফলে এটিকে এখনো “সরকারিভাবে নিশ্চিত ৫০০ কোটি ডলারের চুক্তি” না বলে “৫০০ কোটি ডলারের চুক্তির খবর” বলা অধিক নির্ভুল। 

সব মিলিয়ে সৌদি-চীন ড্রোন সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন স্পষ্ট। এক দশক আগে যে সম্পর্ক মূলত প্রস্তুত চীনা ড্রোন কেনার মাধ্যমে এগিয়েছিল, সেটি এখন সম্ভাব্য স্থানীয় উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। জেদ্দায় ৫০০ কোটি ডলারের উইং লুং-৩ উৎপাদন প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত ও বাস্তবায়িত হলে এটি সৌদি আরবের সামরিক শিল্প স্থানীয়করণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের উপস্থিতি—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য ঘটনা হবে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর